প্রতিদিন স্কুল, কলেজ বা অফিসে আমরা অধীর আগ্রহে যার অপেক্ষা করি, তা হলো— 'টিফিন'। অথচ আমাদের এই অত্যন্ত প্রিয় আর ঘরোয়া শব্দটি কিন্তু বাংলা শব্দ নয়, এমন কি ভারতীয় কোনো শব্দও নয়? কোথা থেকে কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শব্দটি ঢুকে পড়লো সে ইতিহাস কিন্তু বেশ মজার।
![]() |
| শব্দের অলিগলি: আমাদের প্রিয় টিফিন। |
● গল্পটি হলো :
'টিফিন' শব্দটি এসেছে ইংরেজি 'Tiffin' থেকে। মজার ব্যাপার হলো, আঠারো শতকের দিকে ব্রিটিশ ইংরেজিতে 'Tiffing' (টিফিং) মানে ছিল— দুপুর বেলা হালকা কিছু পান করা (বিশেষ করে পানীয়)। কিন্তু, ভারতীয়রা (বিশেষ করে বাঙালিরা) কৃষিপ্রধান জাতি হওয়ার কারণে দুপুরবেলা ভারী খাবার (যেমন— ভাত, ডাল, মাছ বা তরকারি) খেতে পছন্দ করে। ফলে খাবারের ধরন যাই হোক, ব্রিটিশদের অফিস-আদালতের নিয়মে দুপুরের সেই নির্দিষ্ট বিরতি বা টিফিনের সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের চিরাচরিত ভারী দুপুরের আহারের নামটিও 'টিফিন'-এ রূপান্তরিত হয়ে গেল।
আজ আমরা যে টিফিন ক্যারিয়ার বা টিফিন বক্স ব্যবহার করি, তার নামটিও এই ইতিহাস থেকেই এসেছে। আমাদের প্রতিদিনের চেনা অনেক শব্দের ভেতরেই এমন সব মজার ইতিহাস লুকিয়ে আছে!
● টিফিন বক্স (ডাব্বা) - মুম্বাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত 'ডাব্বাওয়ালা'
টিফিন, টিফিন বক্স - যখন আসলো তখন 'ডাব্বা' আর মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালাদের (Dabbawala) কথা আসবে না, তা কি হয়? টিফিন শব্দটির সঙ্গে যে পাত্রটি জড়িয়ে আছে, তাকে আমরা চলতি কথায় বলি 'ডাব্বা'। এটি মূলত একটি হিন্দি শব্দ, যার অর্থ হলো খাবার রাখার কৌটা। এই ডাব্বা বা খাবার রাখার কৌটাকে কেন্দ্র করেই মুম্বাইয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম নিখুঁত লজিস্টিক ব্যবস্থা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য ঘরে তৈরি গরম খাবার তাদের কর্মস্থলে পৌঁছে যায়। আর যারা পৌঁছে দেন তারা হলেন 'ডাব্বাওয়ালা'। এটি আজ বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিষয়।
● হারিয়ে যাওয়া - স্থানান্তরে স্থান :
জানলে অবাক হবেন, যে 'টিফিন' শব্দ ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না, সেই শব্দটি কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মানুষ খুব একটা ব্যবহার করে না। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ ডিকশনারিতে 'Tiffin' শব্দটির পাশে পরিষ্কারভাবে লেখা থাকে 'Indian English'. অর্থাৎ, যারা শব্দটি (ভারতে এসে) তৈরি করলো তারাই একে বর্জন করে দিয়েছে। তারা একে 'লাঞ্চ' বা 'স্ন্যাকস' বলতেই বেশি পছন্দ করে।
● সবশেষে :
যে শব্দটি একসময় ছিল হালকা পানীয় পানের বিরতি, আজ তা আমাদের পেট ও মনের খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ব্রিটিশরা আমাদের এই শব্দ শিখিয়েছিল, আজ তাদের দেশে এই শব্দটি প্রায় বিলুপ্ত! অথচ আমাদের বাঙালির প্রতিদিনের আড্ডায়, স্কুল-কলেজের বারান্দায় আর অফিসের ডেস্কে 'টিফিন' শব্দটি খুবই জনপ্রিয় এবং আজও সগৌরবে টিকে আছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।