শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (২য় পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা,

​আগের পর্বে আমরা একটি জুয়েলারির সাইনবোডের সাধারণ কিছু অসাবধানতা ও বানান বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। অনেকেই সেই আলোচনাটি পছন্দ করেছেন এবং চারপাশের ভাষাচর্চাকে একটি 'জ্যান্ত পাঠশালা'র রূপ দেওয়ার এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

​​আজকের (২৩শে মে, ২০২৬) খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাতেই একটি বড় লটারির বিজ্ঞাপনের দিকে নজর আটকে গেল। ১ কোটি টাকা জেতার আনন্দের খবরের মূল শিরোনামে এমন কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ প্রয়োগ চোখে পড়ল, যা আজকের জ্যান্ত পাঠশালার আসরে একটি সহজ আলোচনার মাধ্যমে নির্ণয় করে চিনে নেওয়া যাক।

লটারির বিজ্ঞাপনের শিরোনামে হাওড়া-এর এবং বিজয়ী শব্দের ব্যাকরণগত ভুল প্রয়োগ।
লটারির বিজ্ঞাপনে বিভক্তি ও শব্দপ্রয়োগের বিভ্রাট।

       (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পুরো বিজ্ঞাপনের বয়ানে বা নিচের বিস্তারিত অনুচ্ছেদে আরও কোনো ভুলত্রুটি আছে কিনা, তা মূল্যায়ন বা নির্ধারণ করা আমাদের আজকের উদ্দেশ্য নয়; আমরা কেবল এই প্রধান শিরোনামটুকুর ভেতরের ভাষাতাত্ত্বিক দিক নিয়েই আলোচনা করছি।)

১. ‘হাওড়া-এর’ বনাম ‘হাওড়ার’ (বিভক্তি বিভ্রাট) :

​বিজ্ঞাপনের মূল শিরোনামে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মূল শব্দটির সঙ্গে 'এর' বিভক্তি জুড়ে দিতে মাঝখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেন (-) ব্যবহার করা হয়েছে— "হাওড়া-এর"।

বিভ্রাট : আজকাল কম্পিউটারে বা মোবাইলে বাংলা টাইপ করার সময় (যেমন অভ্র বা অন্য কোনো ফোনেটিক কিবোর্ডে) অনেকেই মূল শব্দটিকে আলাদা করে হাইলাইট করতে বা সঠিক বিভক্তিটি মেলাতে না পেরে শব্দের শেষে হাইফেন (-) কিংবা ঊর্ধ্বকমা বা অ্যাপস্ট্রফি (') বসিয়ে দেন। যেমন— হাওড়া-এর, হাওড়া’র, কলকাতা-এর, কলকাতা’র ইত্যাদি।

নিয়ম : বাংলা ভাষার প্রমিত বানান রীতি ও ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী, শব্দের শেষে বিভক্তি (র, এর, কে, তে) যুক্ত করার সময় কোনো রকম হাইফেন বা ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করা ঠিক নয়। বিভক্তি সবসময় মূল শব্দের গায়ে সরাসরি যুক্ত হয়ে একটি একক শব্দ তৈরি করে।

শুদ্ধ প্রয়োগ হবে— 'হাওড়ার' (একইভাবে 'কলকাতা-এর' না লিখে লিখতে হবে 'কলকাতার', 'ঢাকা-এর' না লিখে লিখতে হবে 'ঢাকার')।

২. ‘জয়ী’ নাকি ‘বিজয়ী(শব্দের তাৎপর্যগত তফাত) :

​এই শিরোনামে আরেকটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে— "বিজয়ী"। খবরের কাগজে বা অন্যত্র এই ধরণের শব্দবন্ধ আজকাল খুবই প্রচলিত এবং আমাদের চোখ-কান সয়ে গেছে। তবে চলন্ত ভাষায় বহুল ব্যবহৃত হলেও, ব্যাকরণ আর শব্দের আসল অর্থের নিরিখে এখানে একটা সূক্ষ্ম তফাত রয়ে গেছে।

(পাঠকদের মনে করিয়ে দিই, 'জয়' ও 'বিজয়' শব্দের অন্তর্নিহিত ও তাত্ত্বিক পার্থক্য নিয়ে আমাদের এই ব্লগে পূর্বেই বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। আজ সেই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই লটারির এই শব্দচয়নটি আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।)

যুক্তি : লটারি জেতাটা মূলত একটা আকস্মিক ঘটনা এবং ভাগ্যের খেলা, যেখানে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা নিজের ব্যক্তিগত লড়াই থাকে না। তাই এক্ষেত্রে প্রমিত বাংলায় 'জয়ী হলেন' বা সরাসরি 'জিতলেন' বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

​অন্য দিকে, 'বি' (বিশেষ) পূর্বক 'জয়' থেকে আসে 'বিজয়ী'। এটি মূলত তখনই খাটে যখন কেউ কোনো বিশেষ বীরত্ব দেখান, কিংবা পর্যায়ক্রমিক কিছু জয়ের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত কোনো সাফল্য বা ট্রফি অর্জন করেন (যেমন কোনো টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দল)। লটারিতে যেহেতু এই ধাপে ধাপে লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা বা প্রক্রিয়ার ব্যাপারটি নেই, তাই বিজ্ঞাপনে বহুল প্রচলিত হলেও শব্দটির এমন প্রয়োগ আসলে কিছুটা আলঙ্কারিক বা অতি-নাটকীয়।

এক নজরে শুদ্ধিপত্র :

ভুল প্রয়োগ সঠিক বানান / প্রয়োগ কেন ভুল? (যুক্তি)
হাওড়া-এর / হাওড়া'র হাওড়ার শব্দের শেষে বিভক্তি যুক্ত করার সময় হাইফেন বা অ্যাপস্ট্রফি বসে না।
১ কোটির বিজয়ী (লটারির ক্ষেত্রে) ১ কোটি জয়ী / জিতলেন লটারি ভাগ্যের খেলা, ধাপে ধাপে জিতে আসা কোনো বীরত্বের লড়াই বা 'বিজয়' নয়।

পরিশেষে :

বিজ্ঞাপন হোক কিংবা সাধারণ লেখালেখি, বাংলা ভাষার এই ছোটখাটো নিয়মগুলো খেয়াল না রাখলে বাক্যের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনই ভাষার বিকৃতি ঘটে। কোটি টাকার বিজ্ঞাপনেও যখন এই ধরণের অসাবধানতা আমাদের চোখে পড়ে, তখন বুঝতে হবে প্রমিত বাংলা বানানের সচেতনতা আজও কতটা জরুরি।

​আমরা যারা নিয়মিত শিখছি বা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ চাই, তাদের উচিত চারপাশের এই ছোটখাটো ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করা যে কতটা জরুরি—তা অনুধাবন করতে পারলেই আমাদের এই জ্যান্ত পাঠশালায় শেখা সার্থক হবে।

প্রসঙ্গত জানুন 👇

জয় ও বিজয় - পার্থক্য ও সঠিক প্রয়োগ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (২য় পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা, ​আগের পর্বে আমরা একটি জুয়েলারির সাইনবোডের সাধারণ কিছু অসাবধানতা ও বানান বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা ক...