বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

কারক চেনার সহজ পাঠ : কর্তৃ-কর্ম-করণ (দ্বিতীয় পর্ব)

নমস্কার,

'পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা' ব্লগে সকলকে স্বাগত। 'কারক চেনার সহজ পাঠ'এর প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি একটি বাক্যের মাধ্যমে কীভাবে ছয়টি কারককে চেনা যায়। আজ আমরা সেই পরিবারের প্রথম তিন সদস্য— কর্তা, কর্ম এবং করণকে খুব কাছ থেকে চিনব। পরীক্ষার খাতায় এই তিনটি কারককে আলাদা করা নিয়ে সকলের মনে যে ধন্দ থাকে, এই আলোচনায় তা দূর হবে।

১. কর্তৃকারক (Nominative Case):

সহজ কথা : বাক্যে যে কাজটি সম্পাদন করে, সেই রাজা বা হিরোই হলো কর্তা।

চেনার কৌশল : ক্রিয়াকে 'কে' বা 'কারা' দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যাবে সেটাই হলো কর্তা বা কর্তৃকারক।

উদাহরণ : "পুরোহিতমশাই পুষ্প নিবেদন করেন।" (এখানে প্রশ্ন : কে নিবেদন করেন? — উত্তর : পুরোহিতমশাই, সুতরাং 'পুরোহিতমশাই' হলো কর্তৃকারক)।

বিশেষ বিষয় : কর্তা বা কর্তৃপদ সবসময় ক্রিয়ার প্রধান পরিচালক।

২. কর্মকারক (Accusative Case):

সহজ কথা : কর্তা যাকে আশ্রয় করে কাজটি করছে সেই ব্যক্তি বা বিষয়-বস্তুই হলো কর্ম।

চেনার কৌশল : ক্রিয়াকে 'কী' বা 'কাকে' দিয়ে প্রশ্ন করলে যা/যে উত্তর পাওয়া যাবে তাই হলো কর্ম বা কর্মকারক।

উদাহরণ : "পুরোহিতমশাই পুষ্প নিবেদন করেন।" (এখানে প্রশ্ন: কী নিবেদন করেন? — উত্তর : পুষ্প, সুতরাং 'পুষ্প' হলো কর্মকারক)।

বিশেষ বিষয় : সতর্ক থাকতে হবে নিমিত্ত কারকের সাথে কর্মকারককে গুলিয়ে না যায়। যেখানে স্রেফ অবজেক্ট হিসেবে কিছু থাকে, তাই কর্ম।

৩. করণকারক (Instrumental Case):

সহজ কথা : যার দ্বারা বা যার সাহায্যে কাজটি সম্পন্ন হবে সেটাই হলো করণ।

চেনার কৌশল : ক্রিয়াকে 'কীসের দ্বারা' বা 'কীসের সাহায্যে' দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যাবে সেটাই হবে করণকারক।

উদাহরণ : "পুরোহিতমশাই নিজ হাতে পুষ্প নিবেদন করেন।" (এখানে প্রশ্ন: কিসের দ্বারা নিবেদন করেন? — উত্তর : নিজ হাতে/হাতে'র দ্বারা, সুতরাং 'হাতে' হলো করণকারক)।

বিশেষ বিষয় : বাক্যে 'দ্বারা', 'দিয়া', 'কর্তৃক' বা 'সাহায্যে' শব্দগুলো উহ্য বা প্রকাশ্য থাকে।

সহজ ছবি ও ছকে কারক চেনা (ছাত্রছাত্রীদের জন্য):

কারক প্রশ্ন উত্তর (উদাহরণ থেকে)
কর্তৃকারক (কর্তা) কে? / কারা? পুরোহিতমশাই
কর্মকারক (কর্ম) কী? / কাকে? পুষ্প
করণকারক (করণ) কিসের দ্বারা? নিজ হাতে

পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা - কারক ও বিভক্তি চেনার সহজ উপায়। কর্তৃ, কর্মকারক ও করণকারক নির্ণয় করার কৌশল।
কারক চেনা : কর্তৃ, কর্ম ও করণ
আপাতশেষে : 

বর্তমান পর্বে কর্তা-কর্ম-করণ - তিনটি কারকের আলোচনায় তাদের লক্ষণ ও পার্থক্য বুঝে তাদের চিনে নেওয়াটা খুব সহজ হবে। পরের পর্বে আমরা অপাদান, অধিকরণ ও নিমিত্ত কারকের বিস্তৃত আলোচনায় তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য গুলো বুঝে নেবার চেষ্টা করবো। 

শুদ্ধ বাংলা সহজ সঙ্গী হয়ে সঙ্গে থাকুক।

পরের পর্ব পড়তে ও সহজে কারক নির্ণয়ের কৌশল জানতে ক্লিক করুন ⤵️

কারক চেনার সহজ পাঠ : অপাদান-অধিকরণ-নিমিত্ত (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

কারক চেনার সহজ পাঠ - একটি বাক্যেই ছয়টি কারক (প্রথম পর্ব)

নমস্কার,

'পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা' ব্লগে সকলকে স্বাগত। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকের অনুরোধে শুরু করছি বাংলা ব্যাকরণ তথা 'কারক' নিয়ে একেবারে গোড়া থেকে অত্যন্ত সহজভাবে এই আলোচনা সিরিজ। ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিষয়টি একটু-আধটু জটিল মনে হলেও এই পর্বভিত্তিক আলোচনায় তা অত্যন্ত সহজ বোধগম্য হবে বলেই আশা করছি।

কারক আসলে কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, বাক্যের অন্তর্গত ক্রিয়াপদের সঙ্গে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক, তাকেই কারক বলে। অর্থাৎ, বাক্যে যে কাজটি হচ্ছে (ক্রিয়া), তার সঙ্গে অন্যান্য পদের কী যোগসূত্র আছে, সেটাই কারক নির্ণয়ের মূল চাবিকাঠি।

একটি ম্যাজিক বাক্য!

অনেকের কাছেই ৬টি কারক মুখস্থ করা বা মনে রাখা খুব কঠিন মনে হয়। কিন্তু এখানে আমি এমন একটি বাক্যের কথা বলব, যার মধ্যে ৬টি কারকই সুন্দরভাবে লুকিয়ে আছে। বাক্যটি ভালো করে লক্ষ করা যাক :

"পুরোহিতমশাই প্রতিদিন মন্দির প্রাঙ্গণে থালা হতে নিজ হাতে জনসাধারণকে প্রসাদ দিতেন।

এই বাক্যটি থেকে সহজেই কীভাবে ৬টি কারক খুঁজে পাওয়া যায়, তা নিচের ছবি ও ছকটির মাধ্যমে দেখা যাক -

একটিমাত্র বাক্যের বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারক চেনার সহজ পাঠের সচিত্র ছক।
একনজরে সব কারক
প্রশ্নউত্তরকারকের নাম
কে দিতেন?পুরোহিতমশাইকর্তৃকারক
কী দিতেন?প্রসাদকর্মকারক
কিসের দ্বারা দিতেন?নিজ হাতেকরণকারক
কাদের নিমিত্তে/উদ্দেশ্যে দিতেন?জনসাধারণকেনিমিত্ত কারক
কোথা হতে দিতেন?থালা হতেঅপাদান কারক
কোথায়/কখন দিতেন?মন্দির প্রাঙ্গণে / প্রতিদিনঅধিকরণ কারক
একটি প্রয়োজনীয় তথ্য:

বর্তমান সময়ের আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ এবং পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী, পুরনো 'সম্প্রদান কারক'-কে এখন 'নিমিত্ত কারক' হিসেবে অভিহিত করা হয়। যেহেতু জনসাধারণকে এখানে প্রসাদ দেওয়া হচ্ছে তাঁদের 'উদ্দেশ্যে' বা 'নিমিত্তে', তাই বর্তমান নিয়মে একে নিমিত্ত কারক বলাই বিধেয়। 

সংযোজন : অনেক যুক্তিবাদী ভাষাপ্রেমী-ব্যাকরণবিদ এবং পাঠক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে প্রসাদ দেওয়ায় নিমিত্ত ভাব অস্পষ্ট বা সঠিকভাবে প্রকাশিত নয়, বরং প্রসাদ দেওয়া- কে তারা গৌণকর্ম হিসেবে দেখাতে চান। তাঁদের যুক্তি ও আধুনিক ব্যাকরণরীতিকে সম্মান জানিয়ে সমস্ত কারক সম্বলিত আরও একটি নিটোল উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো যেখানে নিমিত্ত কারক স্পষ্টভাবে বোধগম্য হবে বলে মনে করছি।
উদাহরণ : শ্রদ্ধেয় পুরোহিতমশাই প্রতিদিন ভোরে দেবালয়ে নিজ হাতে থালা হতে দেবতার উদ্দেশ্যে পুষ্প নিবেদন করেন।
এখানে :কর্তা: পুরোহিতমশাই, কর্ম: পুষ্প, করণ: নিজ হাতে, নিমিত্ত: দেবতার উদ্দেশ্যে, অপাদান: থালা হতে, অধিকরণ: দেবালয়ে / প্রতিদিন ভোরে

পরিশেষে :

আলোচনাটি কেমন লাগল এবং কতটা বোঝার পক্ষে সহায়ক হলো, তা জানালে খুশি হব। এবং পরবর্তী পর্বগুলো আরও সমৃদ্ধভাবে সাজাতে অনুপ্রাণিত হবো। আপনারাও কি এমন কোনো বাক্যের কথা জানেন যেখানে ছয়টি কারকই বর্তমান? কমেন্টে শেয়ার করুন, আলোচনা চলুক!
একটি বিশেষ কথা— আমার লেখায় (ব্লগে) সুদূর বোর্ডম্যান থেকে শুরু করে ঘরের কাছের বালুরঘাট পর্যন্ত যে বিপুল সাড়া পেয়েছি, তা দেখে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সত্যিই অভিভূত। এই নিরন্তর ভালোবাসাই আমার এই ব্লগটিকে সার্থক করে তুলবে।
​পরবর্তী পর্বে আমরা কর্তৃকারক, কর্মকারক ও করণকারক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় ফিরব। 
শুদ্ধ বাংলা সহজ সঙ্গী হয়ে সঙ্গে থাকুক।

পরের পর্ব পড়তে ও সহজে কারক নির্ণয়ের কৌশল জানতে ক্লিক করুন ⤵️

 

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

শব্দের গল্প : পাউরুটি আর বনরুটি

জলখাবারে পাউরুটি বা বনরুটি আমাদের অতি পরিচিত। কিন্তু এই দুটি নামের পেছনেই লুকিয়ে আছে বিদেশি ভাষার প্রভাব এবং মজার কিছু ইতিহাস। আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা কীভাবে ভিনদেশি শব্দকে আপন করে নিয়েছে, এই দুটি শব্দ তার উদাহরণ।

পাউরুটি, বনরুটি এবং বাংলার আটার রুটির একটি নান্দনিক ছবি
পাউরুটি ও বনরুটি : ভিনদেশি স্বাদ আর দেশি ঐতিহ্য 

পাউরুটি : পা দিয়ে মাখা নয়!

পাউরুটি নিয়ে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা আছে— অনেকে মনে করেন এটি পা দিয়ে মাখা হতো বলে এর নাম 'পাওরুটি'। এটি সম্পূর্ণ ভুল। আসলে এই নামটির মূলে রয়েছে পর্তুগিজ ভাষা।

পর্তুগিজ  উৎস : পর্তুগিজ ভাষায় রুটিকে বলা হয় 'Pão' (পাউ/পাও)। ষোড়শ শতাব্দীতে তারা যখন ভারতে আসে, তারাই প্রথম ময়দা ও ইস্ট দিয়ে তৈরি এই বিশেষ ধরনের (চৌকো করে কাটা স্লাইস / Slice করা) সেঁকা রুটি নিয়ে এসে এ দেশে জনপ্রিয় করে। 

বাংলার ছোঁয়া : বাংলার মানুষ তখন সাধারণত হাতে তৈরি চ্যাপ্টা রুটিতে অভ্যস্ত ছিল। তারা তাদের নিজেদের চেনা আটার রুটি থেকে এই বিশেষ ধরনের রুটিকে আলাদা করে চিনতে পর্তুগিজদের ‘পাউ’ আর দেশি ‘রুটি’ মিলিয়ে নাম দিল— ‘পাউরুটি ’। আক্ষরিক অর্থে এর মানে দাঁড়ায় ‘রুটি-রুটি’।

বনরুটি : নাম কি অরণ্য থেকে এল?

বনরুটির নাম শুনলে মনে হতে পারে এর সাথে বোধহয় বন বা জঙ্গলের কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু এর জন্ম ইতিহাসও বেশ আধুনিক এবং বিদেশি।

ইংরেজি উৎস : ইংরেজি শব্দ ‘Bun’ (বান) থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি। ইংরেজিতে ছোট, গোল এবং কিছুটা মিষ্টি স্বাদের রুটিকে ‘Bun’ বলা হয়।

বাংলার ছোঁয়া : ব্রিটিশ আমলে যখন বাংলায় এই গোল গোল রুটিগুলো জনপ্রিয় হতে শুরু করল, তখন ইংরেজি ‘Bun’ শব্দের সাথে আমাদের ‘রুটি’ শব্দটি জুড়ে গিয়ে তৈরি হলো— ‘বনরুটি’

পরিশেষে

আজকের দিনে পাউরুটি বা বনরুটি আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এদের নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা পর্তুগিজ ও ইংরেজি প্রভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলা ভাষা সব সময় নতুনের সাথে নিজের মেলবন্ধন ঘটাতে পছন্দ করে।

● আরো 'শব্দের গল্প' জানতে ক্লিক করুন। 

    চশমা 👓 পরলেই কি তবে চশমখোর !                                                                                                                                                                                                                                                                             




বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

অর্ধাঙ্গিনী আছে, কিন্তু 'অর্ধাঙ্গ' কেন নেই? পুরুষ কি তবে কারো অর্ধেক নয়?

বিবাহিতা নারীদের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই 'সহধর্মিনী' বা 'অর্ধাঙ্গিনী' শব্দটি ব্যবহার করি। বিশেষ করে বিয়ের কার্ড বা কোনো অনুষ্ঠানে এই শব্দগুলো আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু ভাষার ছাত্র হিসেবে কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে—এই শব্দগুলো শুধুই নারীবাচক কেন? কেন আমরা কোনো পুরুষকে তার স্ত্রীর 'অর্ধাঙ্গ' বা 'সহধর্মী' হিসেবে সম্বোধন করি না?
একপাশে শিব ও পার্বতীর অর্ধনারীশ্বর রূপ এবং অন্যপাশে ল্যাপটপ ও আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার তুলনামূলক অলঙ্করণ।
নারী-পুরুষ : অর্ধনারীশ্বর
 ব্যাকরণ ও সমাজ:

'অর্ধাঙ্গিনী' শব্দটি এসেছে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ হিসেবে। পৌরাণিক 'অর্ধনারীশ্বর' রূপ থেকে এই ধারণার জন্ম। সেখানে ভাবা হয়, স্ত্রী হলেন স্বামীর দেহের বাম অর্ধেক। অর্থাৎ, পুরুষের অস্তিত্ব পূর্ণ করতে স্ত্রীর প্রয়োজন। তাহলে, একই ভাবে নারী বা স্ত্রীর অস্তিত্ব পূর্ণ করতে পুরুষের প্রয়োজন। 'অর্ধাঙ্গ' বলে একটি শব্দও আছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ব্যাকরণগতভাবে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দটি থাকলেও আমাদের সমাজে তার প্রয়োগ নেই।

​    এর কারণ সম্ভবত আমাদের পুরনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সেখানে পুরুষকে মনে করা হতো একটি স্বতন্ত্র ও মূল সত্তা, আর স্ত্রীকে ভাবা হতো তার অংশ বা পরিপূরক। তাই নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে পরিচয় দেওয়া হলেও, পুরুষকে স্ত্রীর সাপেক্ষে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি সেই সময়ের সমাজ বা ভাষা-কারিগরেরা।

দর্শনের ভিন্ন সুর : স্ত্রী যখন প্রকৃতি

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ভারতীয় দর্শনে বা তন্ত্রশাস্ত্রে স্ত্রীকে বলা হয়েছে 'প্রকৃতি'—যিনি সমস্ত শক্তির উৎস এবং আধার। সাংখ্য দর্শন অনুযায়ী, পুরুষ (সত্তা) নিস্ক্রিয়, আর প্রকৃতি হলেন সক্রিয় চালিকাশক্তি। প্রকৃতি ছাড়া পুরুষ অসম্পূর্ণ।

​আশ্চর্যের বিষয় এখানেই—দর্শনের পাতায় স্ত্রীকে 'আদ্যাশক্তি' বা 'শক্তির আধার' হিসেবে এত উঁচু স্থান দিলেও, আমাদের দৈনন্দিন ভাষার প্রয়োগে তাকে কেবল কারো 'অর্ধেক' বা 'সহধর্মিনী' (যিনি স্বামীর ধর্ম পালনে সহায়তা করেন) বানিয়ে রাখা হয়েছে। দর্শনের সেই 'সমগ্র' কেন ভাষার কারসাজিতে শুধুই 'অংশ' হয়ে রইল, তা ভাবার মতো বিষয়।

সবশেষে :

সময় বদলেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলি, তখন ভাষাতেও তার প্রতিফলন থাকা জরুরি। একজন নারী যদি পুরুষের 'অর্ধাঙ্গিনী' হতে পারেন, তবে একজন পুরুষও তো তার স্ত্রীর 'অর্ধেক আকাশ' বা 'অর্ধাঙ্গ' হতে পারেন। আমরা কি তবে 'সহধর্মিনী'র গণ্ডি পেরিয়ে 'জীবনসঙ্গী' বা 'জীবনসাথী'র মতো ভারসাম্যপূর্ণ শব্দ গুলোবেছে নিব ? নাকি নতুন করে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দটিকে অভিধান থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনব?

আপনার কী মনে হয়? ভাষা এবং সমাজ ভাবনায় আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে জানাবেন।

জানুন : আরো 'শব্দের গল্প'

    চশমা 👓 পরলেই কি তবে চশমখোর ❗️

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

শব্দের গল্প : আমাদের চশমা 👓

আমাদের প্রতিদিনের অতি প্রয়োজনীয় সঙ্গী হলো 'চশমা'। এই অতি পরিচিত শব্দটি কিন্তু আমাদের খাঁটি বাংলা শব্দ নয়। এটি এসেছে সুদূর পারস্য (ইরান) থেকে।

একটি পুরনো বইয়ের ওপর রাখা চশমা এবং পাশে পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা ব্লগের শিরোনাম।
   আমাদের চশমা : চোখ থেকে মনের মণিকোঠায় এই শব্দের যাত্রাটা বেশ রোমাঞ্চকর!
১. উৎপত্তির ইতিহাস:

​ফারসি শব্দ 'চশম' (Chashm) মানে হলো 'চোখ'। আর সেই চোখকে সাহায্য করার জন্য বা চোখের রক্ষাকবচ  হিসেবে যে কাচের যন্ত্রটি আমরা ব্যবহার করি, ফারসি ব্যাকরণ অনুযায়ী তার নাম হয়ে গেছে 'চশমা'। মুঘল আমলে ভারতবর্ষের রাজসভার ভাষা ছিল ফারসি। সেই রাজকীয় শাসনের হাত ধরেই শব্দটি আমাদের জীবন ও ভাষার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

​২. চশমা বনাম চশমখোর:

'চশম' শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে চোখের মায়া। কিন্তু এই 'চশম' থেকে আসা সব শব্দ কিন্তু আবার চোখের পক্ষে আরামদায়ক নয়! যেমন— ফারসি ভাষায় 'চশমখোর' শব্দটির অর্থ কিন্তু চশমা পরা কোনো মানুষ নয়।

​বাংলায় 'খোর' অর্থে যেমন 'খাওয়া' বোঝায় (যেমন: সুদখোর বা ঘুষখোর), সেই হিসেবে 'চশমখোর' হলেন তিনিই— যিনি নিজের চক্ষু-লজ্জাকেই খেয়ে ফেলেছেন। ব্যাকরণের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উল্লেখ করি, এটি কিন্তু একটি চমৎকার উপপদ তৎপুরুষ সমাস (চক্ষু-লজ্জাকে খেয়েছেন যিনি)। অর্থাৎ, চশমা আমাদের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করলেও, সেই দৃষ্টিতে যদি সামাজিক লজ্জার অভাব থাকে, তবেই মানুষ 'চশমখোর' বা নির্লজ্জ হয়ে ওঠে।  

৩. 'উপনেত্র' কেন টিকল না?

​পরবর্তীতে সংস্কৃত মূল থেকে চশমার খাঁটি বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে 'উপনেত্র' শব্দটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে 'চশমা' বাঙালির কানে ও মুখে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, কৃত্রিমভাবে তৈরি সেই গুরুগম্ভীর শব্দটি আর পরবর্তীতে টিকেনি। এটি এখন কেবল অভিধানের পাতায় বন্দি, আর 'চশমা' রাজত্ব করছে আমাদের চোখে চোখে।

৪. সবশেষে:

ভাষার এই বহমানতাই তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। 'উপনেত্র' হয়তো তাত্ত্বিকভাবে সঠিক ছিল, কিন্তু 'চশমা' জিতে নিয়েছে বাঙালির আবেগ আর অভ্যেসকে। ফলে উপনেত্রকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি, চশমার কাচেই বর্ণময় পৃথিবীটাকে দেখতে অভ্যস্ত হয়েছি।

● আরো 'শব্দের গল্প' জানতে ক্লিক করুন-

  শব্দের গল্প: টিফিন এলো কোথা থেকে?

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

শুদ্ধ বাংলা সহজে জানুন : ১০টি প্রশ্নের একটি মজার কুইজ (পর্ব-২)


পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা কুইজ পর্ব-২ এর ব্যানার যা শুদ্ধ বাংলা বানান ও প্রমিত নিয়ম নিয়ে তৈরি।

প্রিয় পাঠক ও ভাষাপ্রেমী অনুরাগী,

আমি পিন্টু স্যার। আমার ব্লগ 'পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা'-তে সকলকে স্বাগত জানাই। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা খুবই সমৃদ্ধ এবং সুন্দর। কিন্তু,আমরা প্রতিদিন কথা বলতে বা দ্রুত লিখতে, টাইপ করতে অসতর্কতার কারণে অনেক ভুল বানান বা ব্যাকরণ ব্যবহার করে ফেলি। প্রমিত বাংলার আধুনিক নিয়মগুলো জানা থাকলে এই ভুলগুলো অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। 

প্রথম পর্বের কুইজে আপনাদের অভূতপূর্ব সাড়া দেখে আমি আনন্দিত। বাংলা ভাষার প্রতি আপনাদের এই ভালোবাসা আমাকে দ্বিতীয় পর্বটি আনতে উৎসাহিত করেছে। আজ এমন ১০টি বিশেষ প্রশ্নের একটি কুইজ সাজিয়েছি যেগুলো আমাদের প্রতিদিনের লেখালেখিতে ব্যবহৃত হয়। দেখুন তো, আপনি কত স্কোর করতে পারছেন।

 কুইজটি শুরু করতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন -

👉  https://forms.gle/AhThFLX7vnnX9xe76

আরো কুইজ: ক্লিক করুন -

👉  https://pintusir-sohojbangla.blogspot.com/2026/03/blog-post_29.html

বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

বজ্রকণ্ঠ : ব্যাকরণ ও প্রয়োগের দ্বিমুখী লড়াই

বাংলা ব্যাকরণে কিছু শব্দ আছে যা আমাদের প্রায়ই ধাঁধায় ফেলে দেয়। 'বজ্রকণ্ঠ' তেমনই একটি শব্দ। এই শব্দটি কি কেবল একটি গুণ, নাকি কোনো ব্যক্তিকে বোঝায়? এর ব্যাসবাক্য করার ওপর ভিত্তি করেই সমাসটি পরিবর্তিত হতে পারে। সহজভাবে বিষয়টি দেখে নেওয়া যাক।
১. যখন এটি উপমান কর্মধারয় সমাস:
​আমরা যখন কারো কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্য বা তীব্রতা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করি, তখন এটি উপমান কর্মধারয় সমাস
ব্যাসবাক্য : বজ্রের ন্যায় (গম্ভীর বা কঠিন) কণ্ঠ।
বিশ্লেষণ : এখানে কণ্ঠের একটি গুণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কণ্ঠস্বরটি বজ্রের মতো শক্তিশালী—এই তুলনাটিই এখানে প্রধান।
২. যখন এটি বহুব্রীহি সমাস:
​আবার যখন আমরা শব্দটি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষায়িত করি, তখন এটি হয়ে যায় বহুব্রীহি সমাস
ব্যাসবাক্য : বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ যাঁর।
বিশ্লেষণ : এখানে 'বজ্র' বা 'কণ্ঠ' কোনোটির অর্থই প্রধান নয়, বরং যার ওইরকম কণ্ঠ আছে সেই ব্যক্তিটিই প্রধান। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বজ্রকণ্ঠের অধিকারী' বলি, তখন এটি বহুব্রীহি সমাস হিসেবেই গণ্য হয়।
বজ্রকণ্ঠ সমাস বিশ্লেষণ - উপমান কর্মধারয় ও বহুব্রীহি সমাসের পার্থক্য।
বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ যাঁর = বজ্রকণ্ঠ
 
অনুরূপভাবে, 'পিতাম্বরশব্দটির ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের সমাস বৈচিত্র্য লক্ষ্য করি, যা একই সাথে কর্মধারয় ও বহুব্রীহি সমাস হতে পারে।
৩. রূপক কর্মধারয় কি হতে পারে?
​অনেকে ব্যাসবাক্য করার সময় 'বজ্র রূপ কণ্ঠ' বলে থাকেন। কিন্তু ব্যাকরণগতভাবে কণ্ঠ সরাসরি বজ্র হয়ে যায় না, বরং বজ্রের গুণের সাথে কণ্ঠের তুলনা করা হয়। তাই এটি 'উপমান' হিসেবে ধরাটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
উপসংহার :
ব্যাকরণ সবসময় শব্দের প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। যখন 'বজ্রকণ্ঠ' শব্দটি দিয়ে সাধারণ গাম্ভীর্য বোঝানো হবে, তখন এটি উপমান কর্মধারয়; আর যখন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হবে, তখন এটি বহুব্রীহি।
আপনি কোন ব্যাখ্যাটিকে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন? কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।

পড়ুন : সমাস নিয়ে আরও সহজ পাঠ -

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (২য় পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা, ​আগের পর্বে আমরা একটি জুয়েলারির সাইনবোডের সাধারণ কিছু অসাবধানতা ও বানান বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা ক...