| নারী-পুরুষ : অর্ধনারীশ্বর |
'অর্ধাঙ্গিনী' শব্দটি এসেছে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ হিসেবে। পৌরাণিক 'অর্ধনারীশ্বর' রূপ থেকে এই ধারণার জন্ম। সেখানে ভাবা হয়, স্ত্রী হলেন স্বামীর দেহের বাম অর্ধেক। অর্থাৎ, পুরুষের অস্তিত্ব পূর্ণ করতে স্ত্রীর প্রয়োজন। তাহলে, একই ভাবে নারী বা স্ত্রীর অস্তিত্ব পূর্ণ করতে পুরুষের প্রয়োজন। 'অর্ধাঙ্গ' বলে একটি শব্দও আছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ব্যাকরণগতভাবে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দটি থাকলেও আমাদের সমাজে তার প্রয়োগ নেই।
এর কারণ সম্ভবত আমাদের পুরনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সেখানে পুরুষকে মনে করা হতো একটি স্বতন্ত্র ও মূল সত্তা, আর স্ত্রীকে ভাবা হতো তার অংশ বা পরিপূরক। তাই নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে পরিচয় দেওয়া হলেও, পুরুষকে স্ত্রীর সাপেক্ষে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি সেই সময়ের সমাজ বা ভাষা-কারিগরেরা।
দর্শনের ভিন্ন সুর : স্ত্রী যখন প্রকৃতি
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ভারতীয় দর্শনে বা তন্ত্রশাস্ত্রে স্ত্রীকে বলা হয়েছে 'প্রকৃতি'—যিনি সমস্ত শক্তির উৎস এবং আধার। সাংখ্য দর্শন অনুযায়ী, পুরুষ (সত্তা) নিস্ক্রিয়, আর প্রকৃতি হলেন সক্রিয় চালিকাশক্তি। প্রকৃতি ছাড়া পুরুষ অসম্পূর্ণ।
আশ্চর্যের বিষয় এখানেই—দর্শনের পাতায় স্ত্রীকে 'আদ্যাশক্তি' বা 'শক্তির আধার' হিসেবে এত উঁচু স্থান দিলেও, আমাদের দৈনন্দিন ভাষার প্রয়োগে তাকে কেবল কারো 'অর্ধেক' বা 'সহধর্মিনী' (যিনি স্বামীর ধর্ম পালনে সহায়তা করেন) বানিয়ে রাখা হয়েছে। দর্শনের সেই 'সমগ্র' কেন ভাষার কারসাজিতে শুধুই 'অংশ' হয়ে রইল, তা ভাবার মতো বিষয়।
সবশেষে :
সময় বদলেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলি, তখন ভাষাতেও তার প্রতিফলন থাকা জরুরি। একজন নারী যদি পুরুষের 'অর্ধাঙ্গিনী' হতে পারেন, তবে একজন পুরুষও তো তার স্ত্রীর 'অর্ধেক আকাশ' বা 'অর্ধাঙ্গ' হতে পারেন। আমরা কি তবে 'সহধর্মিনী'র গণ্ডি পেরিয়ে 'জীবনসঙ্গী' বা 'জীবনসাথী'র মতো ভারসাম্যপূর্ণ শব্দ গুলোবেছে নিব ? নাকি নতুন করে 'অর্ধাঙ্গ' শব্দটিকে অভিধান থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনব?
আপনার কী মনে হয়? ভাষা এবং সমাজ ভাবনায় আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে জানাবেন।
জানুন : আরো 'শব্দের গল্প'
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।