পোশাক হিসেবে 'চুড়িদার' (churidar) আজ আমাদের ভীষণ পরিচিত। সাধারণত কামিজের নিচে সালোয়ারের পরিবর্তে কুঁচকানো যে আঁটসাঁট পাজামাটি পরা হয়, সেটিই হলো চুড়িদার। কিন্তু মজার বিষয় হলো, হাতের চুড়ি কীভাবে পায়ে চলে গেল! শব্দটি এলোই বা কোথা থেকে? চলুন জেনে নেওয়া যাক এই পোশাকের নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ইতিহাস।
'চুড়িদার' নামের উৎস : তৎসম থেকে উর্দু হয়ে আগমন'
গুগল ও উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, 'চুড়িদার' শব্দটি মূলত উর্দু ভাষা হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ শতকে এটি সরাসরি ইংরেজি শব্দভাণ্ডারেও (churidar) জায়গা করে নেয়।
তবে শব্দটির আসল শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে। এর মূল লুকিয়ে আছে প্রাচীন সংস্কৃতির তৎসম শব্দ ‘চূডক’ (যার অর্থ চূড়া বা গোলাকার বলয়)-এর মধ্যে। এই ‘চূডক’ শব্দটিই প্রাকৃতের পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে উত্তর ভারতের মাটিতে উর্দু/হিন্দি ভাষায় তদ্ভব শব্দ ‘চুরি’ (चूड़ी)-তে রূপ নেয়। পরবর্তীতে মোঘল আমলের দরবারি সংস্কৃতির প্রভাবে এই উর্দু 'চুরি' শব্দের সাথে ফারসি প্রত্যয় ‘দার’ (যার অর্থ যুক্ত বা ধারী) যুক্ত হয়ে তৈরি হয় ‘চুড়িদার’। এই সম্পূর্ণ তৈরি রূপেই শব্দটি পরবর্তীতে আমাদের বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে চুড়িদার মানে হলো— "যা চুড়ির মতো দেখতে" বা "যাতে চুড়ির মতো ভাঁজ বা কুঁচি আছে"।
| হাতের একগোছা ‘চুড়ি’ থেকে পায়ের ‘চুড়িদার’— নারী-পুরুষ উভয়েরই এক ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশন। |
কীভাবে এলো এই নামকরণ ?
এই পাজামা কাটার এবং সেলাই করার একটা বিশেষ কৌশল আছে। এটি লম্বায় পায়ের আসল মাপের চেয়ে বেশ খানিকটা বড় তৈরি করা হয়। যখন এই আঁটসাঁট পাজামাটি পরা হয়, তখন অতিরিক্ত কাপড়টুকু গোড়ালির ওপর জড়ো হয়ে ছোট ছোট বৃত্তাকার ভাঁজ বা কুঁচি তৈরি করে।
পায়ের নিচের অংশের কাপড়ের এই গোল গোল ভাঁজগুলো দেখতে অবিকল হাতে একগোছা চুড়ি পরে থাকলে যেমন দেখায়, ঠিক তেমন লাগে। কাপড়ের এই চুড়ির মতো ভাঁজের কারণেই এই বিশেষ পাজামার নাম হয়ে যায় ‘চুড়িদার’।
ব্রিটিশদের চোখে এর অদ্ভুত নাম !
এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সময় ইংরেজরা যখন প্রথম এই আঁটসাঁট কুঁচকানো পাজামা দেখে, তখন তারা বেশ আমোদ পেয়েছিল। তারা এর নাম দিয়েছিল 'লং-ড্রয়ার' (Long-drawer)। আবার এই পোশাক পা ঢাকা থাকায় মশার কামড় থেকে বাঁচত, তাই অনেকে একে রসিকতা করে বলত 'মসকিউটো ড্রয়ার' (Mosquito drawer)! পরে অবশ্য ইংরেজি অভিধানেও ‘churidar’ শব্দটি নিজস্ব জায়গা করে নেয়।
মোঘল দরবার থেকে আধুনিক ফ্যাশন
চুড়িদারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে মোঘল আমলে এই পোশাকের ব্যাপক প্রচলন ছিল। মোঘল সম্রাট, দরবারের উচ্চপদস্থ পুরুষ এবং নারীরা রেশম বা মখমলের তৈরি এই ধরনের আঁটসাঁট পাজামা পরতেন। তৎকালীন দরবারি চিত্রকলাগুলোতেও এর প্রচুর প্রমাণ মেলে। অর্থাৎ, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
একটি ব্যাকরণগত তথ্য (বানান) : ‘ড়’ নাকি ‘র’ ?
মূল উর্দু বা হিন্দি উচ্চারণে শব্দটিতে ‘ড়’ (Churidar) ধ্বনিটি স্পষ্ট। তাই উইকিপিডিয়া বা গুগলে 'চুড়িদার' বানানটিই বেশি দেখা যায়। তবে আধুনিক বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতি অনুযায়ী, বিদেশী বা মিশ্র শব্দে ‘ড়’-এর ব্যবহার সরলীকৃত করে 'চুরিদার' (র দিয়ে) লেখাও এখন অভিধানসিদ্ধ। তবে শব্দটির মূল উৎস যেহেতু হাতের ‘চুড়ি’, তাই এর ভেতরের ঐতিহাসিক ও নান্দনিক ভাবটি বজায় রাখতে এখানে এই গল্পে আমরা 'চুড়িদার' বানানটিকেই প্রাধান্য দিয়েছি।
সবশেষে সংক্ষেপে
পায়ের কাছে কাপড়ের কুঁচিগুলো দেখতে ঠিক হাতে পরা একগোছা ‘চুড়ি’-র মতো লাগে বলেই পোশাকটির নাম হয়েছে ‘চুড়িদার’। শব্দের এই বিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পোশাকের নামকরণের পেছনে কত সূক্ষ্ম ও নান্দনিক পর্যবেক্ষণ লুকিয়ে থাকে!
আরো পড়ুন ⤵️
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।