আজকের দিনে 'সাবান' ছাড়া আমাদের একটা দিনও চলে না। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত হাত-মুখ ধোয়া, স্নান করা কিংবা জামাকাপড় কাচার জন্য সাবান আমাদের পরম বন্ধু। কিন্তু আমাদের অনেকেরই অজানা যে, এই 'সাবান' শব্দটি আমাদের খাঁটি বাংলা শব্দ নয়! আর এর ইতিহাসে জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর বিশ্বভ্রমণ এবং এক প্রাচীন সভ্যতার পথে বিবর্তনের বিস্তৃত কাহিনি।
| সাবান রহস্য : রোমান পাহাড় (Mons Sapo) থেকে বাংলার আধুনিক স্নানঘর। |
এখানে জেনে নেওয়া যাক আমাদের অতি পরিচিত ‘সাবান’ শব্দের একদম গোড়ার গল্প।
১. শব্দের জন্ম ও বিশ্বভ্রমণ (Origin & Etymology)
'সাবান' শব্দটির বাংলা ভাষায় আগমন পর্তুগিজদের হাত ধরে হলেও, এর শিকড় লুকিয়ে আছে আরও গভীরে :
পর্তুগিজ সংযোগ : মধ্যযুগে পর্তুগিজ নাবিক ও ব্যবসায়ীরা যখন বাংলায় আসে, তখন তাদের পর্তুগিজ শব্দ 'sabão' (সাবাও) থেকে বাংলা ভাষায় 'সাবান' শব্দটি গৃহীত হয়।
ভাষার আদি ইতিহাস ও ইউরোপীয় শিকড় : এই পর্তুগিজ শব্দটি আসলে এসেছে প্রাচীন ল্যাটিন শব্দ 'sapo' থেকে, আর এই ল্যাটিন শব্দটির জন্ম হয়েছিল ইউরোপের একদম প্রাচীন যুগের একটি মূল আঞ্চলিক (প্রোটো-জার্মানিক) শব্দ 'saipô' থেকে। হাজার বছর আগে ইউরোপের উত্তরাংশের প্রাচীন উপজাতিরা পশুর চর্বি আর গাছের ছাই পুড়িয়ে এক ধরণের পরিষ্কার করার মিশ্রণ তৈরি করত এবং তাকেই তারা বলত 'saipô'। পরে রোমানরা যখন চারদিকে সাম্রাজ্য বিস্তার করে, তখন তারা এই শব্দটি লুফে নেয় এবং নিজেদের ভাষায় একে 'sapo' বলতে শুরু করে। মজার ব্যাপার হলো, এই একটি প্রাচীন শব্দ থেকেই কিন্তু আজ পর্তুগিজদের 'sabão', ইংরেজদের 'soap' এবং ফরাসিদের 'savon' শব্দের জন্ম হয়েছে। আর সেই পর্তুগিজ 'sabão'-ই আমাদের বাঙালি জিভের ছোঁয়ায় আজ 'সাবান' হয়ে গেছে।
২. ব্যাকরণের তাৎপর্য (Grammatical Identity)
বাংলা ব্যাকরণের নিয়মে 'সাবান' একটি বিদেশী শব্দ এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে এটি একটি পর্তুগিজ আগন্তুক শব্দ।
বাঙালিরা এতটাই আপন করে এই শব্দটিকে নিজেদের ভাষায় মিশিয়ে নিয়েছে যে, আজ একে আলাদা করে বিদেশী শব্দ বলে চেনাই যায়না। আনারস, আলমারি, মতোই সাবানও আমাদের যাপিত জীবনের সাথে ব্যাকরণগতভাবে স্থায়ী ঘরসংসার পেতে বসেছে।
৩. মজার ও অজানা ইতিহাস (Interesting Facts & Legends)
সাবানের ইতিহাস ঘাঁটলে প্রাচীন রোমের এক দারুণ কিংবদন্তি এবং ইউরোপের শিল্পকলার ইতিহাস পাওয়া যায়:
মাউন্ট সাপো (Mount Sapo) উপাখ্যান : প্রাচীন রোমান কিংবদন্তি অনুসারে, 'মাউন্ট সাপো' নামক একটি পাহাড়ে দেবতাকে পশুবলি দেওয়া হতো। বলিদানের পর পশুর চর্বি এবং কাঠের ছাই ওই পাহাড়ের মাটিতে জমে থাকত। বৃষ্টি হলে সেই বৃষ্টির জল পাহাড় বেয়ে নেমে চর্বি ও ছাইয়ের সাথে মিশে এক ধরনের ফেনা বা কাদামাটির মিশ্রণ তৈরি করত, যা এসে মিশত পাশের নদীতে। প্রাচীন মানুষ লক্ষ্য করেছিল, এই মিশ্রণ যুক্ত জল কাপড়ের ময়লা খুব সহজে পরিষ্কার করে দিচ্ছে! সেই 'সাপো' পাহাড়ের নামানুসারেই এই জিনিসের নাম হয়ে যায় 'sapo' বা সাবান।
কারিগরি দক্ষতা ও শিল্পকলার ছোঁয়া : সপ্তম শতাব্দীতে ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্সে সাবান তৈরি করা কেবল একটা সাধারণ কাজ ছিল না। সেখানকার কারিগরেরা প্রাচীন পদ্ধতির পশুর চর্বির ব্যবহার পুরোপুরি বদলে ফেলে তার জায়গায় জলপাই তেল (Oils) এবং নানাভিধ সুগন্ধি ফুল-পাতার নির্যাস ব্যবহার করতে শুরু করেন। কারিগরদের এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করেই আজ বিশ্ব জুড়েই সাবান তৈরিতে পশুর চর্বির ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং তার স্থান নিয়েছে সম্পূর্ণ উদ্ভিদজাত তেল ও ভেষজ উপাদান। সাবানের সুগন্ধ, আকৃতি ও গুণের কারণে বর্তমানে এটি একটি উচ্চমানের নিখুঁত কারিগরি বিদ্যা তথা শিল্পকলায় পরিণত হয়েছে।
আভিজাত্যের প্রতীক : শুরুর দিকে সাবান কিন্তু সাধারণ মানুষের জিনিস ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত মহার্ঘ্য এবং কেবল ধনী ও রাজপরিবারের লোকেরাই পর্তুগিজদের থেকে সাবান কিনে ব্যবহার করতে পারত।
৪. শব্দের অর্থান্তর (Change of Meaning) : জড়বস্তু থেকে মানুষের স্বভাব
বাংলা ভাষার একটি দারুণ গুণ হলো, এটি যেকোনো শব্দকে নিজের মতো করে বদলে নিতে পারে। 'সাবান' একটি জড় বস্তু হলেও, বাঙালি একে মানুষের চরিত্রেও বসিয়ে দিয়েছে!
যেমন আমরা কথায় কথায় বলি—"ওকে আর সাবান দিও না।" কিংবা "বেশি সাবান মেখো না।"
এখানে 'সাবান দেওয়া' বা 'সাবান মাখা' মানে কিন্তু স্নান করা নয়, এর অর্থ হলো কাউকে অতিরিক্ত তোষামোদ করা বা তেল দেওয়া। সাবান যেমন পিচ্ছিল এবং পরিষ্কার করার কাজ করে, তেমনই তোষামোদকারীরাও কথা মসৃণ বলে নিজের রাস্তা পরিষ্কার করে নেয়!
এক নজরে 'সাবান'-এর বংশলতিকা :
| প্রা. জার্মানিক | ল্যাটিন | পর্তুগিজ | বাংলা | ইংরেজি | ফরাসি |
|---|---|---|---|---|---|
| saipô | sapo | sabão | সাবান | soap | savon |
শেষকথন :