বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

বজ্রকণ্ঠ : ব্যাকরণ ও প্রয়োগের দ্বিমুখী লড়াই

বাংলা ব্যাকরণে কিছু শব্দ আছে যা আমাদের প্রায়ই ধাঁধায় ফেলে দেয়। 'বজ্রকণ্ঠ' তেমনই একটি শব্দ। এই শব্দটি কি কেবল একটি গুণ, নাকি কোনো ব্যক্তিকে বোঝায়? এর ব্যাসবাক্য করার ওপর ভিত্তি করেই সমাসটি পরিবর্তিত হতে পারে। সহজভাবে বিষয়টি দেখে নেওয়া যাক।
১. যখন এটি উপমান কর্মধারয় সমাস:
​আমরা যখন কারো কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্য বা তীব্রতা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করি, তখন এটি উপমান কর্মধারয় সমাস
ব্যাসবাক্য : বজ্রের ন্যায় (গম্ভীর বা কঠিন) কণ্ঠ।
বিশ্লেষণ : এখানে কণ্ঠের একটি গুণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কণ্ঠস্বরটি বজ্রের মতো শক্তিশালী—এই তুলনাটিই এখানে প্রধান।
২. যখন এটি বহুব্রীহি সমাস:
​আবার যখন আমরা শব্দটি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষায়িত করি, তখন এটি হয়ে যায় বহুব্রীহি সমাস
ব্যাসবাক্য : বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ যাঁর।
বিশ্লেষণ : এখানে 'বজ্র' বা 'কণ্ঠ' কোনোটির অর্থই প্রধান নয়, বরং যার ওইরকম কণ্ঠ আছে সেই ব্যক্তিটিই প্রধান। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বজ্রকণ্ঠের অধিকারী' বলি, তখন এটি বহুব্রীহি সমাস হিসেবেই গণ্য হয়।
বজ্রকণ্ঠ সমাস বিশ্লেষণ - উপমান কর্মধারয় ও বহুব্রীহি সমাসের পার্থক্য।
বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ যাঁর = বজ্রকণ্ঠ
 
অনুরূপভাবে, 'পিতাম্বরশব্দটির ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের সমাস বৈচিত্র্য লক্ষ্য করি, যা একই সাথে কর্মধারয় ও বহুব্রীহি সমাস হতে পারে।
৩. রূপক কর্মধারয় কি হতে পারে?
​অনেকে ব্যাসবাক্য করার সময় 'বজ্র রূপ কণ্ঠ' বলে থাকেন। কিন্তু ব্যাকরণগতভাবে কণ্ঠ সরাসরি বজ্র হয়ে যায় না, বরং বজ্রের গুণের সাথে কণ্ঠের তুলনা করা হয়। তাই এটি 'উপমান' হিসেবে ধরাটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
উপসংহার :
ব্যাকরণ সবসময় শব্দের প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। যখন 'বজ্রকণ্ঠ' শব্দটি দিয়ে সাধারণ গাম্ভীর্য বোঝানো হবে, তখন এটি উপমান কর্মধারয়; আর যখন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হবে, তখন এটি বহুব্রীহি।
আপনি কোন ব্যাখ্যাটিকে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন? কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।

পড়ুন : সমাস নিয়ে আরও সহজ পাঠ -

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬

শব্দের অলিগলি : আমাদের প্রিয় 'টিফিন' 🍱

প্রতিদিন স্কুল, কলেজ বা অফিসে আমরা অধীর আগ্রহে যার অপেক্ষা করি, তা হলো— 'টিফিন'। অথচ আমাদের এই অত্যন্ত প্রিয় আর ঘরোয়া শব্দটি কিন্তু বাংলা শব্দ নয়, এমন কি ভারতীয় কোনো শব্দও নয়? কোথা থেকে কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শব্দটি ঢুকে পড়লো সে ইতিহাস কিন্তু বেশ মজার।

'Tiffin history by Pintu Sir'
শব্দের অলিগলি: আমাদের প্রিয় টিফিন।

● গল্পটি হলো :

'টিফিন' শব্দটি এসেছে ইংরেজি 'Tiffin' থেকে। মজার ব্যাপার হলো, আঠারো শতকের দিকে ব্রিটিশ ইংরেজিতে 'Tiffing' (টিফিং) মানে ছিল— দুপুর বেলা হালকা কিছু পান করা (বিশেষ করে পানীয়)। কিন্তু, ভারতীয়রা (বিশেষ করে বাঙালিরা) কৃষিপ্রধান জাতি হওয়ার কারণে দুপুরবেলা ভারী খাবার (যেমন— ভাত, ডাল, মাছ বা তরকারি) খেতে পছন্দ করে। ফলে খাবারের ধরন যাই হোক, ব্রিটিশদের অফিস-আদালতের নিয়মে দুপুরের সেই নির্দিষ্ট বিরতি বা টিফিনের সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের চিরাচরিত ভারী দুপুরের আহারের নামটিও 'টিফিন'-এ রূপান্তরিত হয়ে গেল।

আজ আমরা যে টিফিন ক্যারিয়ার বা টিফিন বক্স ব্যবহার করি, তার নামটিও এই ইতিহাস থেকেই এসেছে। আমাদের প্রতিদিনের  চেনা অনেক শব্দের ভেতরেই এমন সব মজার ইতিহাস লুকিয়ে আছে!

● টিফিন বক্স (ডাব্বা) - মুম্বাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত 'ডাব্বাওয়ালা'

​টিফিন, টিফিন বক্স - যখন আসলো তখন 'ডাব্বা' আর মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালাদের (Dabbawala) কথা আসবে না, তা কি হয়? টিফিন শব্দটির সঙ্গে যে পাত্রটি জড়িয়ে আছে, তাকে আমরা চলতি কথায় বলি 'ডাব্বা'। এটি মূলত একটি হিন্দি শব্দ, যার অর্থ হলো খাবার রাখার কৌটা। এই ডাব্বা বা খাবার রাখার কৌটাকে কেন্দ্র করেই মুম্বাইয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম নিখুঁত লজিস্টিক ব্যবস্থা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য ঘরে তৈরি গরম খাবার তাদের কর্মস্থলে পৌঁছে যায়। আর যারা পৌঁছে দেন তারা হলেন 'ডাব্বাওয়ালা'। এটি আজ বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিষয়।

​● হারিয়ে যাওয়া - স্থানান্তরে স্থান :

​জানলে অবাক হবেন, যে 'টিফিন' শব্দ ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না, সেই শব্দটি কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মানুষ খুব একটা ব্যবহার করে না। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ ডিকশনারিতে 'Tiffin' শব্দটির পাশে পরিষ্কারভাবে লেখা থাকে 'Indian English'. অর্থাৎ, যারা শব্দটি (ভারতে এসে) তৈরি করলো তারাই একে বর্জন করে দিয়েছে। তারা একে 'লাঞ্চ' বা 'স্ন্যাকস' বলতেই বেশি পছন্দ করে। 

● সবশেষে :

যে শব্দটি একসময় ছিল হালকা পানীয় পানের বিরতি, আজ তা আমাদের পেট ও মনের খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ব্রিটিশরা আমাদের এই শব্দ শিখিয়েছিল, আজ তাদের দেশে এই শব্দটি প্রায় বিলুপ্ত! অথচ আমাদের বাঙালির প্রতিদিনের আড্ডায়, স্কুল-কলেজের বারান্দায় আর অফিসের ডেস্কে 'টিফিন' শব্দটি খুবই জনপ্রিয় এবং আজও সগৌরবে টিকে আছে।

রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

শুদ্ধ বাংলা সহজে জানুন : ১০টি প্রশ্নের একটি মজার কুইজ (পর্ব-১)

বাংলা বানান চর্চার অনলাইন কুইজ : পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা (পর্ব-১)

প্রিয় পাঠক ও ভাষাপ্রেমী অনুরাগী,

আমি পিন্টু  স্যার। আমার ব্লগ 'পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা'-তে সকলকে স্বাগত জানাই।

​আমাদের মাতৃভাষা বাংলা খুবই সমৃদ্ধ এবং সুন্দর। কিন্তু বর্তমানে দ্রুত লিখতে, টাইপ করতে বা অসতর্কতার কারণে আমরা অনেক সময় সাধারণ কিছু বানানে ভুল করে ফেলি। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার লক্ষ্য হলো, সহজে খেলার ছলে বাংলার শুদ্ধ রূপটি জেনে নেওয়া ও আলোচনা করা।

​আজ এমন ১০টি বিশেষ প্রশ্নের একটি কুইজ সাজিয়েছি যেগুলো আমাদের প্রতিদিনের লেখালেখিতে ব্যবহৃত হয়। দেখুন তো, আপনি কত স্কোর করতে পারছেন!

​👉 কুইজটি শুরু করতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন: https://forms.gle/6NidFdy7qgLLLto36




শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

চন্দ্রবিন্দু : নামের রহস্য ও বিন্দু থেকে চাঁদ হয়ে ওঠার ইতিহাস

বাংলা বর্ণমালায় 'চন্দ্রবিন্দু' (ঁ) একটি অতি ক্ষুদ্র চিহ্ন হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই ছোট্ট চিহ্নটি শব্দের উচ্চারণ ও অর্থ—উভয়কেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এর নাম 'চন্দ্রবিন্দু' কেন হলো? অথবা এর আবির্ভাবই বা হলো কীভাবে?

​নিচে সহজভাবে বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো :

১. নামকরণ : আকৃতিগত কারণ (The Visual Aspect)

​চন্দ্রবিন্দু নামটির পেছনে খুব স্পষ্ট একটি দৃশ্যমান কারন রয়েছে। চিহ্নটির দিকে তাকালেই এর দুটি অংশ স্পষ্ট দেখা যায় :

চন্দ্র : নিচে একটি বাঁকানো রেখা আছে যা দেখতে ঠিক দ্বিতীয়ার বাঁকা চাঁদের মতো।

বিন্দু : সেই বাঁকা রেখা বা চাঁদের ঠিক মাঝখানে একটি ফোঁটা বা বিন্দু আছে।

এই চাঁদ আর বিন্দু মিলেই এর নাম হয়েছে 'চন্দ্রবিন্দু'। সংস্কৃতে একে বলা হয় 'অনুনাসিক' চিহ্ন।  

চন্দ্রবিন্দু চিহ্নের গঠন ও ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন
চন্দ্র ও বিন্দুর সমন্বয়ে তৈরি আমাদের প্রিয় চন্দ্রবিন্দু।

২. আবির্ভাবের ইতিহাস (History of origin) : বিন্দু থেকে চন্দ্রবিন্দু

​চন্দ্রবিন্দুর জন্ম ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রাচীনকালে এবং সংস্কৃতে নাসিক্য ধ্বনি (নাক দিয়ে উচ্চারিত শব্দ) বোঝাতে আলাদা কোনো চন্দ্রবিন্দু ছিল না।

আদি পর্যায় : প্রাচীন লিপিগুলোতে সব ধরণের নাসিক্য উচ্চারণ বোঝাতে মাত্রার উপরে কেবল একটি 'বিন্দু' (·) ব্যবহার করা হতো। একে বলা হতো 'অনুস্বার'।

বিভাজন : ধীরে ধীরে লিপিকর ও ভাষাবিদগণ লক্ষ্য করলেন, নাসিক্য উচ্চারণ দুই ধরণের হয়—একটি তীব্র (যেমন: অংক, অংশ) এবং অন্যটি অত্যন্ত হালকা বা কোমল (যেমন: চাঁদ, দাঁত)।

বিবর্তন : এই দুই ধরণের উচ্চারণের পার্থক্য স্পষ্ট করার জন্য আদি 'বিন্দু' চিহ্নটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেল:

​● তীব্র উচ্চারণের জন্য তৈরি হলো বর্তমানের অনুস্বার (ং)।

​● কোমল বা স্বরবর্ণের সাথে মিশে থাকা অনুনাসিক উচ্চারণের জন্য বিন্দুর নিচে একটি অর্ধচন্দ্র যোগ করে তৈরি হলো চন্দ্রবিন্দু (ঁ)।

৩. ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Linguistic Analysis)

​ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে চন্দ্রবিন্দু হলো 'অনুনাসিকতা' (Nasalization)-এর প্রতীক। এর আবির্ভাবের পেছনে প্রধান কারণ ছিল নাসিক্য ব্যঞ্জনের (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) বিলুপ্তি।

বিবর্তনের ধারায় যখন শব্দ থেকে নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনিটি হারিয়ে যায়, তখন তার রেশটুকু আগের স্বরবর্ণের ওপর থেকে যায়। যেমন:

​সংস্কৃত 'দন্ত' - প্রাকৃত 'দত্ত' - বাংলা 'দাঁত'।

এখানে 'ন' ধ্বনিটি লোপ পেয়ে 'দ'-এর ওপর একটি হালকা নাসিক্য টান তৈরি করেছে, যা বোঝাতেই এই বিশেষ চিহ্নের জন্ম।

৪. কেন এটি অনন্য?

​চন্দ্রবিন্দু বাংলা ভাষার এমন এক অলঙ্কার যা -

● অর্থের পার্থক্য করে : 'কাদা' (মাটি) আর 'কাঁদা' (অশ্রুপাত)—এই দুয়ের পার্থক্য গড়ে দেয়।

​● সম্মান প্রদর্শন করে : সাধারণ সর্বনামকে (যেমন: তাকে) সম্মানীয় ব্যক্তিতে (যেমন: তাঁকে) রূপান্তরিত করে।

শেষকথা :

সহজ কথায়, চন্দ্রবিন্দু হলো প্রাচীন 'বিন্দু' বা অনুস্বারের একটি বিবর্তিত ও পরিশীলিত রূপ। এর 'চন্দ্র' অংশটি যেমন এর গঠনকে তুলে ধরে, তেমনি 'বিন্দু' অংশটি এর আদি পরিচয়কে ধরে রেখেছে।

শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

আপনি আপনার স্ত্রীকে 'শ্রীমতী' বলতে পারেন না!

অনেকেই হয়তো শিরোনামটি দেখে অবাক হচ্ছেন। গুগলে খুঁজলেও হয়তো দেখবেন লেখা আছে—নিজের স্ত্রীকে 'শ্রীমতী' বলা যায়। কিন্তু ভাষার শুচিতা ও সম্পর্কের আন্তরিকতার নিরিখে এটি একটি প্রচলিত ভুল। 

● কেন নিজের স্ত্রীর নামের আগে 'শ্রীমতী' ব্যবহার করবেন না? কিছু অকাট্য যুক্তি :

১. আত্ম-প্রশংসার শামিল : নিজের নামের আগে যেমন কেউ 'শ্রী' বা 'শ্রীযুক্ত' বসান না, তেমনি নিজের অর্ধাঙ্গিনী বা জীবনসঙ্গিনীর নামের আগে গুণবাচক বিশেষণ (শ্রীমতী) বসানোও একধরণের নিজেরই প্রশংসা করার শামিল। মার্জিত সমাজে এটি শিষ্টাচার বিরুদ্ধ।

২. আন্তরিকতা বনাম কৃত্রিমতা : স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হৃদয়ের। সেখানে 'শ্রীমতী'র মতো একটি ভারী ও পুঁথিগত বিশেষণ ব্যবহার করলে সম্পর্কের সেই স্বাভাবিক মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায় এবং একধরণের অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বা দূরত্ব তৈরি হয়।

৩. আভিজাত্য খর্ব : একজন উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত মানুষ কখনোই তাঁর পরিবারের অতি কাছের সদস্যদের পরিচয় দেওয়ার সময় বিশেষণ দিয়ে তাঁদের ভারাক্রান্ত করবেন না। অন্যের স্ত্রীকে 'শ্রীমতী' বলাটা আদর্শ এবং সম্মানজনক। তবে নিজের ক্ষেত্রে "ইনি আমার স্ত্রী" বা "ইনি আমার স্বামী" বলার মধ্যে আভিজাত্যের বদলে একধরণের লোকদেখানো ভাব প্রকাশ পাওয়ার ভয় থাকে।

স্ত্রী বনাম শ্রীমতী : ব্যাকরণগত ভুল ও শুদ্ধ শিষ্টাচার।

শেষকথা :

স্বামী হোক বা স্ত্রী — সম্মান হৃদয়ে থাকুক, শব্দের আড়ম্বরে নয়। তাই নিজের পরিবারের অতি কাছের মানুষদের পরিচয় দেওয়ার সময় নামের আগে কোনো গুণবাচক বিশেষণ (শ্রী, শ্রীমতী, শ্রীযুক্ত) ব্যবহার না করাই হলো সঠিক ও মার্জিত মানুষের পরিচয়।

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

​'নীচ' নাকি 'নিচ'? আমরা কি ভুল বানান লিখছি?

আমরা ছাত্রাবস্থায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সবসময় দেখে এসেছি— "নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও"। আবার কোনো বস্তু বা ব্যক্তি সম্পর্কে বলি— "বইটি/লোকটি নীচে আছে"। কিন্তু বর্তমান সময়ের আধুনিক প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম বলছে - এসব ক্ষেত্রে হ্রস্ব-ই-কার দিয়ে 'নিচে'লেখা উচিত।

    ১. নীচ (দীর্ঘ-ঈ দিয়ে) - এটি একটি তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ। এটি মূলত মানুষের চরিত্র বা স্বভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

অর্থ : হীন, অধম, নিকৃষ্ট বা ছোটলোক।

উদাহরণ :  সে অত্যন্ত নীচ প্রকৃতির মানুষ।

২. নিচ (হ্রস্ব-ই দিয়ে) - এটি তদ্ভব (সংস্কৃত থেকে আগত) শব্দ। মূলত অবস্থান বা দিক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলা একাডেমি এবং আধুনিক ব্যাকরণবীদদের মতে 

অর্থ : নিচে অবস্থিত, নিচু স্থান বা তলা।

উদাহরণ :  বইটি টেবিলের নিচে রাখো। বা, নিচে দেখুন।    

নীচ ও নিচ - বানান ভেদে সঠিক প্রয়োগ ও মনে রাখার সহজ উপায় - পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা ব্লগ।
নীচ ও নিচ - কোথায় কোনটি?

সারকথা : নীচ, বা নিচ - কোনোটাই ভুল নয়। তবে প্রয়োগ ক্ষেত্র ভিন্ন। স্বভাব বা চরিত্র বোঝাতে - নীচ, (ঈ-কার দিয়ে) আর অবস্থান বা দিক বোঝাতে - নিচ বা নিচে (ই-কার দিয়ে) ব্যবহার সঠিক।

শেষকথা : ভাষার এই বিবর্তন মূলত আমাদের ভাব প্রকাশের সুবিধার্থেই। প্রমিত নিয়মে নীচ এবং নিচ এর পার্থক্য বজায় রাখলে আমাদের ভাষা আরো নিখুঁত ও অর্থবহ হবে। একজন সচেতন পাঠক এবং লেখক হিসেবে এই সূক্ষ্ম পার্থক্য গুলো আমাদের মেনে চলা উচিত।

●●● এবার দেখুন তো নিচের শূন্য স্থান দুটো পূরণ করতে পারেন কি না?

● নিজের মনকে এতটাই ....১... করবেন না যাতে সকলের সামনে মাথা ...২... করে চলতে হয়। (কমেন্ট করে উত্তর জানান)

শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬

​'লেখ' নাকি 'লেখো'? প্রশ্নপত্রের সেই চিরচেনা ভুল!

"নিচের প্রশ্ন গুলোর উত্তর লেখ।" — বছরের পর বছর ধরে আমরা প্রশ্নপত্রে এই বাক্যটি দেখি এবং নিজেরাও অবলীলায় ব্যবহার করে আসছি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখি, এই 'লেখ' শব্দটির বানান আধুনিক প্রমিত নিয়ম অনুযায়ী কতটুকু সঠিক?

   প্রমিত বাংলা বানান ও-কার ব্যবহারের নিয়ম।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে 'লেখ' নাকি 'লেখো'? - বানানের 
এই গোলকধাঁধায় ছাত্রটির মতো আপনিও কি চিন্তিত?

আমরা ক্লাসে ছাত্রদের বলি 'লেখো', কিন্তু পরীক্ষার পাতায় লিখে দিই 'লেখ'। এই যে দ্বিধা—কখন ও-কার দেবো আর কখন দেবো না—এটিই আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয়। কেবল 'লেখো' নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে 'করো', 'বলো' বা 'হলো'র মতো শব্দগুলো নিয়ে যে বিভ্রান্তি আছে, আজ তা সহজভাবে দূর করা যাক।

১. কেন এই পরিবর্তন ('ও-কার'-এর প্রয়োজন)?

রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমচন্দ্রের যুগে বানানের নিয়ম আজকের মতো ছিল না। তখন অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদেও 'ও-কার' ছাড়াই লেখা হতো। কিন্তু বাংলা বানানের আধুনিক নিয়মে উচ্চারণের স্পষ্টতা বজায় রাখার জন্য শব্দের শেষে ও-কার ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদে (কাউকে কিছু করতে বলা) ও-কার দিলে অর্থের বিভ্রান্তি দূর হয়।

এর ফলে বিশেষ্য (Noun) এবং ক্রিয়াপদ (Verb)-এর মধ্যে যথার্থ পার্থক্য সূচিত করা সম্ভব হয়। যেমন:

  • বল (শক্তি) — বলো (কথা বলা)
  • কর (হাত) — করো (কাজ করা)
  • লেখ (চিত্র) — লেখো (লেখা)

​২. আধুনিক প্রমিত নিয়মের সহজ ছক

মূল শব্দ ও-কারান্ত আধুনিক রূপ উদাহরণ বাক্য
বল বলো তুমি সত্যি কথা বলো।
কর করো মন দিয়ে কাজটা করো।
হল হলো অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হলো।
গেল গেলো সময়মতো সে স্কুলে গেলো।
লেখ লেখো খাতায় পরিষ্কার করে লেখো।

৩. কিছু ব্যতিক্রম ও সতর্কবার্তা:
​সবক্ষেত্রে ও-কার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:
অব্যয় পদে ও-কার নয়: 'কেন', 'যেন', 'হেন'—এই শব্দগুলো যেহেতু অব্যয়, তাই এগুলোতে ও-কার ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
বিশেষ্য বা বিশেষণে ভিন্নতা: অনেক সময় ও-কার ব্যবহারের ফলে শব্দের অর্থ বদলে যেতে পারে। তাই প্রসঙ্গের দিকে নজর রাখা উচিত।
শেষকথা :
 প্রমিত বানানের এই নিয়মগুলো অনুসরণ করলে আমাদের লেখা যেমন নির্ভুল, সুশৃঙ্খল হয়, তেমনি তা আধুনিক বাংলাভাষার মানও রক্ষা করে। তাই আগামীতে বিভিন্ন প্রশ্নপত্র সহ যেকোনো লেখায় মধ্যম পুরুষের অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ হিসেবে আর 'লেখ' নয় 'লেখো' ব্যবহার করবো। শিক্ষার্থীরাও তাহলে সঠিক বানান জানতে ও শিখতে পারবে।

আপনার মতামত জানান:
আপনি আপনার প্রশ্নপত্রে কোনটি ব্যবহার করেন? এমন আরো বানান আছে কি যেগুলো আমাদের দ্বিধায় ফেলে। আপনি জানান। আমরা আলোচনার মাধ্যমে সঠিকটা খুঁজে নেবো। এই পরিবর্তন গুলোই আমাদের ভাষার শ্রী বৃদ্ধি করবে।

বজ্রকণ্ঠ : ব্যাকরণ ও প্রয়োগের দ্বিমুখী লড়াই

বাংলা ব্যাকরণে কিছু শব্দ আছে যা আমাদের প্রায়ই ধাঁধায় ফেলে দেয়। ' বজ্রকণ্ঠ ' তেমনই একটি শব্দ। এই শব্দটি কি কেবল একটি গুণ, নাকি কোনো ব...