শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'শিবির' এ আছে মঙ্গল ও সেবার আদর্শ

"সংস্কৃত 'শিব্' ধাতু থেকে —ভাষার বিবর্তনে 'শিবির' শব্দটি যেভাবে আজও সেবা ও মঙ্গলের আদর্শ বহন করে চলেছে।"

প্রায় প্রতিদিনই 'শিবির' শব্দটি আমরা ব্যবহার করে থাকি যার ব্যবহারিক এবং সাধারণ অর্থ হলো ছাউনি, তাঁবু, বা সাময়িক বাসস্থান। যেমন - শিক্ষাশিবির, শরণার্থী শিবির, বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি অস্থায়ী আস্তানা বোঝাতে 'শিবির' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। 

আভিধানিক অর্থে 'শিবির' বলতে একটি অস্থায়ী বাসস্থান বা সৈন্যবাহিনীর আস্তানা (Camp) বোঝায়।


●শব্দতত্ত্বের বিচারে কিন্তু 'শিবির' শব্দটি কেবল একটি 'তাঁবু' বা 'আস্তানা' নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে কল্যাণ ও সেবার এক দীর্ঘ ইতিহাস। 

শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ :- সংস্কৃত 'শিব্' ধাতু থেকে 'শিবির' শব্দটি এসেছে 'শিব্' ধাতুর মূল অর্থ হলো — যাকে সেবা করা হয় বা যা মঙ্গলময় / কল্যাণকর। 

মূল অর্থের সাথে বর্তমানের সাদৃশ্য :

অনেকে মনে করতে পারেন 'মঙ্গল' বা 'সেবা'র সাথে একটি অস্থায়ী তাঁবুর সম্পর্ক কী? আসলে এর যোগসূত্রটি খুবই গভীর -

নিরাপত্তা ও মঙ্গল : প্রাচীনকালে খোলা আকাশের নিচে বিপদে পড়া মানুষ বা সৈন্যদের জন্য একটি 'শিবির' ছিল অমঙ্গল বা বিপদ থেকে রক্ষার একমাত্র আশ্রয়। অর্থাৎ যা বিপদ থেকে রক্ষা করে 'মঙ্গল' নিশ্চিত করে, সেটিই শিবির।

সেবার আদর্শ :'শিব্'  অন্যতম অর্থ 'সেবা'। এটা লক্ষণীয় যে, আজও আমরা যখন 'রক্তদান শিবির', 'ত্রাণ শিবির' বা 'বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা শিবির' বলি, তখন সেখানে মূলত আর্তমানবতার সেবার অর্থই প্রকাশিত হয়। মূল ধাতুর সেই 'সেবা'র আদর্শটিই আজও এই আধুনিক প্রয়োগগুলোর মধ্যে বেঁচে আছে।

শেষকথা :-

ভাষার বিবর্তনের ধারায় শব্দের বাহ্যিক রূপ কিছুটা বদলালেও তার অন্তরাত্মা বা মূল ধাতুর গুণটি সাধারণত হারায় না। 'শিবির' আজও তার আদি 'সেবা' ও 'মঙ্গলের' আদর্শকে ধারণ করেই আমাদের জীবনযাপনে মিশে আছে।


বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আমরা বলি 'উনিশ', ব্যাকরণ বলে 'একোনবিংশতি'! কেন জানেন?

আমাদের প্রতিদিনের চেনা সংখ্যা'১৯'বা'উনিশ'-এর আড়ালে লুকিয়ে আছে ব্যাকরণের এক গভীর রহস্য। 'একোনবিংশতি' শব্দের অর্থ কি উনিশ? আমাদের চেনা '১৯' সংখ্যাটির আড়ালে ব্যাকরণের অদ্ভুত এবং মজার রহস্য এখানে উন্মোচন করব।

মূল আলোচনা:
বাংলায় আমরা যাকে 'উনিশ' বলি, সংস্কৃত ও শুদ্ধ ব্যাকরণে তাকে বলা হয় 'একোনবিংশতি'।  
শব্দটা ভাঙলে পাওয়া যায়:এক + ঊন + বিংশতি
​ 
এখানে মজার বিষয় হলো:
বিংশতি মানে - ২০
ঊন মানে - কম
​আর এক মানে তো সবার জানা
অর্থাৎ, 'একোনবিংশতি' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো— এক কম যে কুড়ি (২০)। 
আমাদের পূর্বপুরুষরা ১৯ - সংখ্যাটিকে ২০ হওয়ার ঠিক আগের ধাপ হিসেবে দেখতেন।
ব্যাকরণের প্যাঁচ (সহজ করে):
এবার দেখে নেওয়া যাক এটি কোন সমাস? 

ব্যাসবাক্য — এক দ্বারা ঊন যে বিংশতি। ব্যাকরণবিদদের মতে এটি একটি বিশেষ ধরনের তৎপুরুষ সমাস। ​

কেনো এটি বিশেষ তৎপুরুষ?
এতে সাধারণ তৎপুরুষের মতো শুধু বিভক্তি লোপ পায় না, বরং এর অর্থের মধ্যে একটি গাণিতিক লক্ষ্য (২০ পূর্ণ করা) লুকিয়ে থাকে। তাই ব্যাকরণবিদরা একে সাধারণ না বলে 'বিশেষ তৎপুরুষ' বলতে পছন্দ করেন।"
আবার, বিশ পূর্ণ হওয়ার 'নিমিত্ত' বা 'উদ্দেশ্যে' এক কম —এই সূক্ষ্ম বিচারে কথাটি হয়েছে একোনবিংশতি এবং সমাসে হতে পারে চতুর্থী বা নিমিত্ত তৎপুরুষ।

যদি ব্যাসবাক্য হয়- এক ঊন যে বিংশতি।
তাহলে আধুনিক বিচারে এটি উপপদ তৎপুরুষ সমাস।
'ঊন' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'ঊন' ধাতু থেকে। যখন কোনো কৃদন্ত পদের (ধাতু থেকে তৈরি শব্দ) সাথে অন্য পদের সমাস হয়, তখন তাকে উপপদ তৎপুরুষ বলে। 
শেষকথা: 
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি শব্দের পেছনে এমন কত সাহিত্য, কত কৃষ্টি আর ইতিহাস লুকিয়ে আছে, শব্দগুলি সবসময় ব্যবহার করলেও তা খেয়াল করতে পারি না। ১৯ সংখ্যাটি শুনলে এখন কিন্তু 'এক কম বিশ'-এর কথা মনে পড়বে।

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ব্যাসবাক্যই সমাসের নিয়ন্ত্রক

সমাস মূলত শব্দের অর্থগত সংহতি। আমি বলি - অর্থের খেলা। কোনো শব্দকে যখন আমরা ব্যাসবাক্যে অর্থগত বিশ্লেষণ করি, তখন সেই বিশ্লেষণের ভিন্নতার কারণেই সমাসের নাম বদলে যায়। অর্থাৎ, সমাস নির্ধারিত হয় শব্দের বাহ্যিক রূপ দেখে নয়, বরং তার অর্থগত প্রয়োগ দেখে।

উদাহরণসহ আলোচনা - নিচে কয়েকটি জনপ্রিয় উদাহরণ সহ আলোচনা করে দেখা হলো - কিভাবে একই শব্দ অর্থগত বিশ্লেষণে ভিন্ন সমাস হয়।  

                              উদাহরণ : ১

                     পীতাম্বর : কর্মধারয় সমাস

​  : পীত (হলুদ) যে অম্বর (বস্ত্র) = পীতাম্বর। (এখানে বস্ত্রের রঙকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে)।

                     পীতাম্বর : বহুব্রীহি সমাস

 : পীত অম্বর যার = পীতাম্বর (শ্রীকৃষ্ণ)। (এখানে কোনো বস্তুকে না বুঝিয়ে তৃতীয় এক ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে)।

                             উদাহরণ : ২

                        ত্রিনয়ন : দ্বিগু সমাস

​: ত্রি (তিন) নয়নের সমাহার = ত্রিনয়ন। (এখানে তিনটি নয়নের সমষ্টি বা সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে)।

​                       ত্রিনয়ন : বহুব্রীহি সমাস

: ত্রি নয়ন যার = ত্রিনয়ন (দেবী দুর্গা বা শিব)। (এখানে বিশেষ কোনো দেবতাকে নির্দেশ করছে)।

শেষকথা -                                                                 সুতরাং, এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, সমাস কোনো যান্ত্রিক বিষয় নয়, বা নির্দিষ্ট ফর্মুলা মেনে মুখস্থ করার বিষয় নয়; এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে শব্দটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। 

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'অনুস্বার' ( 'ং) এর নাম অনুস্বার কেন ?

 'অনুস্বার' ( 'ং) এর নাম অনুস্বার কেন ?

বাংলা ব্যাকরণে 'অনুস্বার' বা 'অনুস্বর' {ং} নামটির পেছনে সুন্দর একটি যৌক্তিক কারণ আছে। এটি সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

আমরা সবাই জানি 'অনুস্বার' একটি অযোগবাহ বর্ণ। অর্থাৎ, অন্য কোনো স্বরবর্ণের সাহায্য ছাড়া এটি নিজে নিজে শব্দে বসতে পারে না বা উচ্চারিত (বাহিত) হতে পারে না।

কিন্তু, আজকের আলোচ্য বিষয় সেটা নয়, আজকের আলোচ্য হল, 'অনুস্বার' ( 'ং) এর নাম অনুস্বার কেন ?

নামের কারন কী?

ব্যাকরণবিদরা যখন কোনো বর্ণের নাম দেন, তখন তার ধর্ম এবং উচ্চারণ প্রকৃতি বিচার করেই নামকরণ করেন। 'অনুস্বার' শব্দটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

এবার নামের রহস্য দেখা যাক :-

'অনুস্বার' শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: 'অনু' এবং 'স্বার' বা 'স্বর'

​১. অনু : এর অর্থ হলো 'পশ্চাৎ' বা 'পরে'

২. স্বার : এটি এসেছে 'স্বর' শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো 'স্বরবর্ণ' বা 'ধ্বনি'।

​অর্থাৎ, শব্দগতভাবে 'অনুস্বার' মানে হলো — যা স্বরবর্ণের পরে বা পেছনে উচ্চারিত হয়।

ব্যাকরণগত যুক্তি ও উদাহরণ:-

​অনুস্বারকে কেন এই নামে ডাকা হয়, তার প্রধান এবং সহজ কারণ হলো:

একাকী চলতে পারে না : আগেই বলা হয়েছে অনুস্বার একটি অযোগবাহ বর্ণ। ফলে, এটি নিজে নিজে কোনো শব্দ গঠন করতে পারে না বা কোনো শব্দের শুরুতে বসতে পারে না। এটি সর্বদা কোনো একটি স্বরবর্ণের আশ্রয়ে তার পরে বসে। যেমন:-                                                                          'রং' শব্দটি উচ্চারণ করতে গেলে 'র' বর্ণের পরে যে 'অ' স্বরটি লুকিয়ে আছে, অনুস্বার ঠিক তার পরেই উচ্চারিত হচ্ছে। স্বরের পরে বা পেছনে এর অবস্থান নিশ্চিত ভাবে বোঝা যাচ্ছে। এই কারনেই ব্যাকরণবিদরা এর নাম দিয়েছেন অনুস্বার।


শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক নজরে সব সমাস

বাংলা ব্যাকরণে সমাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিচে এক নজরে বিভিন্ন প্রকার সমাস চেনার মূল কৌশল (Shortcuts) তুলে ধরা হলো, সহজ উদাহরণ সহ -

১. দ্বন্দ্ব সমাস ● উভয় পদের অর্থ প্রধান এবং মাঝখানে 'ও', 'এবং', 'আর' থাকে।  

উদাহরণ 》মাতা ও পিতা = মাতা-পিতা

২. কর্মধারয় সমাস ● পরপদের অর্থ প্রধান এবং বিশেষণ (গুণ) বা তুলনা বোঝাবে। 

উদাহরণ 》নীল যে আকাশ = নীলাকাশ

৩. তৎপুরুষ সমাস ● পূর্বপদের বিভক্তি (কে, রে, থেকে, হতে, এর) লোপ পায়। 

উদাহরণ 》বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন

৪. বহুব্রীহি সমাস ● কোনো পদই প্রধান নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন বা তৃতীয় কাউকে বোঝাবে। 

উদাহরণ 》দশ আনন যার = দশানন (রাবণ)

৫. দ্বিগু সমাস ● শুরুতে একটি সংখ্যা থাকবে এবং শেষে 'সমাহার' বোঝাবে। 

উদাহরণ 》তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল

৬. অব্যয়ীভাব সমাস ● শুরুতে উপসর্গ (উপ, যথা, প্রতি, আ) থাকবে এবং এর অর্থই প্রধান হবে। 

উদাহরণ 》কূলের সমীপে = উপকূল 

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কর্মধারয় সমাস চেনার সহজ পাঠ

 

কর্মধারয় সমাস চেনার সহজ কৌশল

কর্মধারয় সমাস আপাত কঠিন মনে হলেও বাস্তবে খুব কঠিন নয়, বরং সহজ; যদি এর মূল রহস্যটি ধরতে পারা যায়। আজকের আমরা একদম সহজ ভাষায় উদাহরণসহ এই সমাসটি চেনার উপায় জানব।

কর্মধারয় সমাস আসলে কী?

​সহজ কথায়, যে সমাসে পরপদের (দ্বিতীয় পদ) অর্থ প্রধান বা বেশি গুরুত্ব পায় এবং প্রথম পদটি দ্বিতীয় পদের একটি বর্ণনা বা বিশেষণ হিসেবে কাজ করে, তাকেই কর্মধারয় সমাস বলে।

মনে রাখার জন্য টিপস :

কর্মধারয় সমাসে উভয় পদ মিলে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র বস্তু বা ব্যক্তিকে বোঝাবে।

উদাহরণ: নীলপদ্ম = নীল যে পদ্ম। 

(এখানে নীল রঙটি বড় কথা নয়, 'পদ্ম' ফুলটিই আসল উদ্দেশ্য। আর 'নীল' শব্দটি পদ্মের বর্ণনা দিচ্ছে। দুটি পদ মিলে একটি বস্তু তথা পদ্মফুলকে বোঝাচ্ছে।)

কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ ও চেনার শর্টকাট

১. সাধারণ কর্মধারয়

​এটি মূলত বিশেষণ (গুণ) এবং বিশেষ্য (নাম) এর মিলন।

বিশেষণ + বিশেষ্য: নীল যে আকাশ = নীলাকাশ।         বিশেষ্য + বিশেষ্য : যিনি জজ তিনিই সাহেব = জজসাহেব।(একই ব্যক্তি)                                                                   বিশেষণ + বিশেষণ: কাঁচা অথচ মিঠা = কাঁচামিঠা।

২. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় (মাঝখানের পদ গায়েব!)

​ব্যাসবাক্যের মাঝখান থেকে যখন কোনো পদ হারিয়ে যায় বা লোপ পায়।

উদাহরণ: সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন। ('চিহ্নিত' শব্দটি লুপ্ত হয়েছে)।                                                          উদাহরণ: পল (মাংস) মিশ্রিত অন্ন = পলান্ন।

৩. উপমান কর্মধারয় (বাস্তব তুলনা)

​যখন দুটি জিনিসের মধ্যে এমন তুলনা হয় যা বাস্তবে সম্ভব এবং এতে একটি সাধারণ গুণ (যেমন: সাদা, লাল, শক্ত) উল্লেখ থাকে।

 চেনার জন্য সহজ টিপস :

 ব্যাসবাক্যে 'ন্যায়' শব্দটি মাঝখানে থাকে।

উদাহরণ: তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র। (তুষার আসলেই সাদা, তাই এটি বাস্তব)।

৪. উপমিত কর্মধারয় (কাল্পনিক তুলনা)

​যখন দুটি জিনিসের মধ্যে এমন তুলনা হয় যা বাস্তবে সম্ভব নয়, অর্থাৎ তুলনাটি অবাস্তব বা কাল্পনিক হয় এবং এতে কোনো সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে না।

চেনার জন্য সহজ টিপস :

 ব্যাসবাক্যে 'ন্যায়' শব্দটি শেষে থাকে।

উদাহরণ: মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ। (মানুষের মুখ তো আর চাঁদ হতে পারে না, এটি কেবলই প্রশংসা বা কল্পনা)।

৫. রূপক কর্মধারয় (অভিন্ন কল্পনা)

​যখন উপমান ও উপমেয়কে একই মনে করা হয়, অর্থাৎ তুলনাটি এমন যে দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। অভেদ রূপে কল্পনা করা হয়।

চেনার উপায়:  ব্যাসবাক্যে 'রূপ' শব্দটি থাকে।

উদাহরণ: প্রাণ রূপ পাখি = প্রাণপাখি, মন রূপ মাঝি = মনমাঝি।

সামগ্রিক ভাবে বিশেষ পরামর্শ

​সমাস নির্ণয় করার সময় নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে — এখানে কি পরপদটিই প্রধান? যদি উত্তর 'হ্যাঁ' হয় এবং প্রথম পদটি দ্বিতীয় পদের বর্ণনা দেয়, তবে চোখ বন্ধ করে সেটি কর্মধারয় সমাস

                             .................................

(Blog টি ঘুরে দেখুন, এখানে সমাসের অন্যান্য শ্রেণি গুলিও উদাহরণ সহ আলোচনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে, কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতে পারেন।)

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সাম্প্রতিক বোর্ড পরীক্ষার পারিভাষিক শব্দ ও নির্ভুল উৎস

 সাম্প্রতিক বোর্ড পরীক্ষার পারিভাষিক শব্দ ও নির্ভুল উৎস (জিজ্ঞাসা পর্ব-১)

অনেক শিক্ষার্থী এবং পাঠকরা ইংরেজি থেকে বাংলা পারিভাষিক শব্দের সঠিক উৎস জানতে চেয়েছেন। ami আমার শিক্ষকতা জীবনে  পড়াশুনা ও বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত কিছু প্রয়োজনীয় শব্দের তালিকা নিচে দিচ্ছি:-

আরো বলি যে, নিচে উল্লেখিত নির্ভরযোগ্য মাধ্যম গুলির সহায়তা নিয়ে আপনারা অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলা পরিভাষা চর্চা করতে পারেন।

নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট:

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি: এদের বানান ও পরিভাষা নীতিই আধুনিক ব্যাকরণে গ্রাহ্য হয়।

বিকাশপিডিয়া (Vikaspedia): সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক শব্দের জন্য এটি সেরা ডিজিটাল উৎস।

সংসদ ইংরেজি-বাংলা অভিধান: এটি একটি ধ্রুপদী এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

বোর্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি শব্দ:

১. Affidavit - হলফনামা

২. Agenda - আলোচ্যসূচি

৩. Cabinet - মন্ত্রিসভা

৪. Data - উপাত্ত

৫. Evidence - সাক্ষ্য বা প্রমাণ

৬. Gazette - গেজেট বা রাজপত্র

৭. Justice - বিচার বা ন্যায়বিচার

৮. Lease - ইজারা

৯. Manuscript - পাণ্ডুলিপি

১০. Personnel - কর্মীদল"

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধীরে ধীরে, না ধীরেধীরে - কীভাবে লিখব?

 অনেক সময় আমরা অনেকেই লেখালেখি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ি - ধীরে ধীরে, বড় বড় - এই শব্দসমূহের মাঝে স্পেস বা ফাঁক দিয়ে লিখব, না এক মাত্রায় - ধীরেধীরে - এই ভাবে লিখব?

বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী 'ধীরে ধীরে', 'বড় বড়' —শব্দ গুলিকে স্পেস বা ফাঁক দিয়ে আলাদা করে লেখাই ঠিক।

এই ধরণের দুটি শব্দের জোড়াকে বলা হয় শব্দদ্বৈত বা শব্দ দ্বিরুক্তি। যখন একই শব্দ পরপর দুইবার ব্যবহৃত হয় (যেমন: ধীরে ধীরে, বড় বড়, লাল লাল), তখন সেগুলোকে সাধারণত আলাদা করে 'ধীরে ধীরে' এইভাবে লেখাই ঠিক। 

বাংলা একাডেমি বা আধুনিক বাংলা বানানের রীতি অনুযায়ী, দ্বিরুক্ত শব্দগুলোর মাঝে ফাঁকা রাখা বা স্পেস দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

এছাড়াও 'ধীরে ধীরে' লিখলে প্রতিটি শব্দের ওপর আলাদা জোর পড়ে, ফলে অর্থের স্পষ্টতা বা পঠনযোগ্যতা বাড়ে

তবে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত লেখার সময় বা বিশেষ কাব্যিক প্রয়োজনে কেউ কেউ 'ধীরেধীরে' একসাথে লিখতে পারেন, কিন্তু আদর্শ ব্যাকরণসম্মত রূপ হলো 'ধীরে ধীরে'।


শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'লেখাপড়া' এবং 'পড়ালেখা'

 বাংলা ভাষায় 'লেখাপড়া' এবং 'পড়ালেখা' শব্দ দুটি প্রয়োগে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ভাষাগত ও পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে।

প্রমিত ও কথ্য রূপের পার্থক্য -

লেখাপড়া - বাংলা ভাষার সবচেয়ে স্বীকৃত (Standard) রূপ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যাচর্চাকে বোঝাতে ডিকশনারি বা আনুষ্ঠানিক দলিলে এই শব্দটিই বেশি ব্যবহৃত হয়।

পড়ালেখা - এটি মূলত একটি চলিত বা আঞ্চলিক ব্যবহারের রূপ। যদিও আধুনিক ব্যবহারে এটিকেও সঠিক ধরা হয়, তবুও আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে 'লেখাপড়া' শব্দটির ওজন বেশি।

​● শিক্ষার পদ্ধতিগত পার্থক্য -

এই ধারণাটি বেশ মজার এবং আনুমানিকও বটে। দুটি শব্দের ক্রম শিক্ষার দুটি ভিন্ন ব্যবহারিক পর্যায়কে নির্ভর করে প্রচলিত হতে পারে :

লেখাপড়া (Writing first): প্রাচীন আমলে আগে হাতেখড়ি হয়ে 'লেখা' বা বর্ণ পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাই 'লেখা' শব্দটি আগে এসেছে।

পড়ালেখা (Reading first): আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানে 'পড়া' বা শোনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, শিশুর পড়া আগে শুরু হয়, তারপর লিখতে শেখানো হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে 'পড়ালেখা' শব্দটির উৎপত্তি হতে পারে।

● তবে, বর্তমান প্রয়োগে এদের কোনো অর্থগত পার্থক্য নেই।

'কত বার' বনাম 'কতবার'

 'কত বার' বনাম 'কতবার'

 'কত' এবং 'বার' - লেখার সময় আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে শব্দ দুটিকে একসঙ্গে  জুড়ে দিই। কিন্তু ভাষার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে এগুলো আলাদা রাখাই ভালো। খাতায় আমরা যত বার খুশি এটি লিখতে পারি, কিন্তু — মাঝখানে একটি স্পেস বা ফাঁক রাখা জরুরি।

বানানের নিয়ম অনুযায়ী, সংখ্যাবাচক বা পরিমাণবাচক শব্দের সঙ্গে 'বার' শব্দটি আলাদাভাবে লিখতে হয়। অর্থাৎ -

শুদ্ধরূপ : কত বার, চার বার, দশ বার ইত্যাদি।

অশুদ্ধরূপ : কতবার, চারবার ইত্যাদি।

সুতরাং, ভাষাগত দিক থেকে বলতে হয় — শব্দ দুটিকে আলাদাভাবে বা স্পেস দিয়ে লিখতে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কি ও কী - কোথায় কী?

 'কি' আর 'কী'-এর মাঝে কোনো পার্থক্য আছে কি?

'কি' আর 'কী'-এর মাঝে পার্থক্য কী?

উপরের প্রশ্ন দুটিতে 'কি' এবং 'কী' দু'ধরণের বানান হয়েছে।বাংলা বানানে 'কি' এবং 'কী'- এর ব্যবহার নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা কাজ করে। তবে এদের পার্থক্য বোঝা খুবই সহজ। নিচের নিয়মটি খেয়াল করা যাক -

১. 'কি' (হ্রস্ব ই-কার দিয়ে)

যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর শুধু 'হ্যাঁ' অথবা 'না' দিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তখন হ্রস্ব ই-কার দিয়ে 'কি' বসে।

* ​এটি মূলত একটি অব্যয় পদ হিসেবে কাজ করে যা প্রশ্ন তৈরি করতে সাহায্য করে।

উদাহরণ: "তুমি কি ভাত খেয়েছ?" (উত্তর আসবে: 'হ্যাঁ' অথবা 'না') ​"আজ কি বৃষ্টি হবে?" (উত্তর আসবে: 'হ্যাঁ' অথবা 'না')

কোথায় কী?

২. 'কী' (দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে)

​যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর শুধু 'হ্যাঁ' বা 'না' দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, বরং কিছু বর্ণনা বা তথ্য দিতে হয়, তখন দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে 'কী' বসে।

* ​এটি সর্বনাম বা বিশেষণ পদ হিসেবে কাজ করে।

উদাহরণ: "তোমার নাম কী?" (এখানে কাউকে তার নাম বলতে হবে, হ্যাঁ/না বললে হবে না)   ​"তুমি বাজার থেকে কী  কিনেছ?" (এখানে কোনো জিনিসের নাম বলতে হবে, হ্যাঁ/না বললে হবে না)  

সহজে মনে রাখার উপায়:-

উত্তরে 'হ্যাঁ' বা 'না' হলে - 'কি' দ্বারা প্রশ্ন করতে হবে।

উত্তরে বর্ণনা দিতে হলে - 'কী' দ্বারা প্রশ্ন করতে হবে।


‘কতগুলি’ বনাম ‘কতকগুলি’—পার্থক্য ও সঠিক প্রয়োগ

'কতগুলি' আর 'কতকগুলি' - এর মাঝে পার্থক্য কী?

‘কতগুলি’ বনাম ‘কতকগুলি’—পার্থক্য ও সঠিক প্রয়োগ

​আমরা বিভিন্ন লেখায় এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার এই দুটি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করি, তবে এদের ব্যবহার একটু সচেতন ভাবে করা প্রয়োজন। নিচে এদের পার্থক্যটি দেওয়া হলো:

​১. কতগুলি (প্রশ্ন করার জন্য)

​যখন কোনো কিছুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা পরিমাণ জানতে চাওয়া হবে, তখন ‘কতগুলি’ ব্যবহার করা দরকার। এটি মূলত একটি প্রশ্নবাচক শব্দ।

উদাহরণ: "ঝুড়িতে কতগুলি আম আছে?" (এখানে আমি সংখ্যাটি জানতে চাইছি)

উদাহরণ: আপনি আজ কতগুলি পোস্ট পড়লেন?

২. কতকগুলি (বিবরণ দেওয়ার জন্য)

​যখন কোনো কিছুর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে জানা থাকে না বা বলতে চাওয়া হয় না, বরং "কিছু সংখ্যক" বা "অনির্দিষ্ট কয়েকটি" বোঝাতে চাওয়া হয়, তখন ‘কতকগুলি’ ব্যবহার করা হয়। এখানে বাড়তি ‘ক’ অনির্দিষ্টতা প্রকাশ করে।

উদাহরণ: "ঝুড়িতে কতকগুলি আম পচা ছিল।" (এখানে আমি কাউকে প্রশ্ন করছি না, বরং একটি তথ্য দিচ্ছি যে কিছু আম পচা ছিল)

উদাহরণ: রাস্তার ধারে কতকগুলি গাছ লাগানো হয়েছে।

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অব্যয়ীভাব সমাস : নামেই যার পরিচয়

 সমাস পর্বের শেষ অব্যয়ীভাব সমাস : নামেই যার পরিচয়

যে সমাসে পূর্বপদে (প্রথম শব্দে) একটি অব্যয় থাকে এবং সেই অব্যয়ের অর্থই প্রধান হিসেবে কাজ করে, তাকেই অব্যয়ীভাব সমাস বলে।

সহজে চেনার উপায়:

অব্যয়ীভাব সমাসের শুরুতে সাধারণত কিছু উপসর্গ বা অব্যয় থাকে, যেমন: উপ, আ, নির, প্রতি, যথা, অনু ইত্যাদি।

কিছু উদাহরণ দেখা যাক:

অভাব অর্থে : ভাতের অভাব = হাভাত

সাদৃশ্য (মিল) অর্থে : দ্বীপের সদৃশ = উপদ্বীপ

ক্ষুদ্র অর্থে : ক্ষুদ্র অঙ্গ = প্রত্যঙ্গ

বিরোধ অর্থে : বিরুদ্ধ বাদ = প্রতিবাদ

কেন এটি অনন্য?

অন্যান্য সমাসে যেখানে পরপদ বা উভয় পদের প্রাধান্য থাকে, অব্যয়ীভাব সমাসে কিন্তু পূর্বপদের (অব্যয়ের) অর্থই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।

পূর্ব পদের অর্থ প্রাধান্য : দেখে নেওয়া যাক-

'হাভাত' শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই: হা (অব্যয়/উপসর্গ) + ভাত (বিশেষ্য)।

'ভাত' বল্লে সাধারণত চোখের সামনে অন্ন বা খাবারের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু যখনই 'হা' (অব্যয়) যুক্ত করে 'হাভাত' বলা হয় তখন আর 'ভাত' প্রধান থাকে না, বরং ভাতের 'অভাব' বা তার অনুপস্থিতিটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই 'অভাব' অর্থটি এসেছে পূর্ব পদের 'হা' থেকে। অর্থাৎ পূর্ব পদের অর্থের প্রাধান্য ঘটল।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বানান সচেতনতা: ‘তফাত’ নাকি ‘তফাৎ’— কোনটি সঠিক?

 বানান সচেতনতা: ‘তফাত’ নাকি ‘তফাৎ’— কোনটি সঠিক?

​আমরা অনেকেই লিখতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ি যে শব্দের শেষে ‘ত’ দেব না ‘ৎ’। বিশেষ করে ‘তফাত’ শব্দটির ক্ষেত্রে এই ভুলটি বেশি চোখে পড়ে। ব্যাকরণের নিয়ম দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাক।

তফাত, নাকি তফাৎ- সঠিক বানান কোনটি?

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে ‘তফাত’ বানানটিই শুদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য। কারণ-

১. উৎস বিচার: ‘তফাত’ একটি আরবি শব্দ (বিদেশি শব্দ)। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, অতৎসম (দেশি, তদ্ভব বা বিদেশি) শব্দের শেষে খণ্ড-ত (ৎ) ব্যবহারের প্রয়োজন নেই, সেখানে কেবল ‘ত’ ব্যবহৃত হবে।

২. খণ্ড-ত (ৎ)-এর ব্যবহার: সাধারণত তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে সন্ধি বা অন্য কারণে খণ্ড-ত (ৎ) ব্যবহৃত হয় (যেমন: হঠাৎ, ভবিষ্যৎ, জগৎ)। কিন্তু বিদেশি শব্দে এর প্রয়োগ ব্যাকরণসম্মত নয়।

বিদেশি শব্দ মানেই ‘ত’— এই নিয়মটি মনে রাখলে আর ভুল হবে না। যেমন: তফাত, শরবত, জাকাত ইত্যাদি।

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তৎপুরুষ সমাস: বিভক্তির লুকোচুরি

তৎপুরুষ সমাস : বিভক্তির লুকোচুরি 

দীর্ঘ দিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বিভক্তির ঝামেলার কারণে ছাত্ররা তৎপুরুষ সমাসকে কঠিন মনে করে, কিন্তু কারকের সাথে মিলিয়ে পড়লে এটি সবার কাছেই পানির মতো সহজ হয়ে যাবে।

১. তৎপুরুষ সমাস কাকে বলে?

যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় এবং পরপদের অর্থের প্রাধান্য থাকে, তাকেই তৎপুরুষ সমাস বলে।

২. কারক ও বিভক্তি অনুযায়ী প্রকারভেদ:

দ্বিতীয়া বা কর্ম তৎপুরুষ (কে/রে লোপ): পূর্বপদে কর্ম কারকের বিভক্তি 'কে/রে' লোপ পায়। যেমন— বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন।

তৃতীয়া বা করণ তৎপুরুষ (দ্বারা/দিয়া/কর্তৃক লোপ): পূর্বপদে করণ কারকের বিভক্তি লোপ পায়। যেমন— মন দিয়া গড়া = মনগড়া।

চতুর্থী বা সম্প্রদান তৎপুরুষ (জন্য/নিমিত্ত লোপ): ব্যাসবাক্যে 'জন্য' বা 'নিমিত্ত' লোপ পায়। যেমন— হজের নিমিত্তে যাত্রা = হজযাত্রা।

পঞ্চমী বা অপাদান তৎপুরুষ (হইতে/থেকে লোপ): পূর্বপদে অপাদান কারকের বিভক্তি লোপ পায়। যেমন— খাঁচা থেকে ছাড়া = খাঁচাছাড়া।

ষষ্ঠী বা সম্বন্ধ তৎপুরুষ (র/এর লোপ): পূর্বপদে সম্বন্ধ পদের বিভক্তি লোপ পায়। যেমন— চায়ের বাগান = চাবাগান।

সপ্তমী বা অধিকরণ তৎপুরুষ (এ/য়/তে লোপ): পূর্বপদে অধিকরণ কারকের বিভক্তি লোপ পায়। যেমন— গাছে পাকা = গাছপাকা।

৩. বিশেষ প্রকার (নঞ তৎপুরুষ / না তৎপুরুষ):

যখন পূর্বপদে না-বোধক অব্যয় (ন, নেই, নাই) থাকে। যেমন— নয় বিশ্বাস = অবিশ্বাস।

মনে রাখবে, তৎপুরুষ সমাসের নামগুলো মূলত কারকের নাম অনুসারেই হয়। তাই কারক ও বিভক্তি চিনতে পারলেই তৎপুরুষ সমাস নির্ণয় করা জলের মতো সহজ হয়ে যায়।


বই থেকে আরো আরো উদাহরণ লক্ষ্য করো, বুঝতে অসুবিধা হলে সরাসরি জিজ্ঞেস করে জেনে নিও। 

শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শুরুতে সংখ্যাবাচক শব্দ Vs দ্বিগু সমাস

 শুরুতে সংখ্যাবাচক শব্দ থাকলেই কি তা দ্বিগু সমাস?

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একটি খুব সাধারণ প্রবণতা হলো শব্দে সংখ্যা দেখলেই সেটিকে 'দ্বিগু সমাস' বলে মনে করা। কিন্তু বাংলা ব্যাকরণ সবসময় এতটা সহজ পথে চলেনা ! আজ সেই ভুল ধারণাটি পরিষ্কার করা যাক।

পার্থক্যটি বোঝা দরকার-

দ্বিগু সমাস: যখন সংখ্যাবাচক শব্দ শুরুতে থাকে এবং তা দিয়ে একটি সমাহার বা সমষ্টি বোঝায়। যেমন: চৌরাস্তা (চার রাস্তার সমাহার)। এখানে রাস্তাগুলোর মিলিত হওয়াটাই প্রধান।

সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি: এখানেও শুরুতে সংখ্যা থাকে, কিন্তু তা সমাহার না বুঝিয়ে একটি তৃতীয় কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে বোঝায়। যেমন: আটচালা। এর ব্যাসবাক্য হলো— "আটটি চাল আছে যে ঘর"। এটি কিন্তু চালের সমষ্টি নয়, বরং একটি বিশেষ ধরণের ঘরকে বোঝাচ্ছে।     

কবি নজরুলের স্মৃতিঘেরা আটচালা

মনে রাখার সহজ উপায়:

যদি সংখ্যা দিয়ে কোনো কিছুর সমাহার বা মিলন বোঝায় তবে সেটি দ্বিগু। আর যদি সংখ্যা দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর বৈশিষ্ট্য বোঝায় তবে সেটি বহুব্রীহি।

প্রিয় ছাত্রছাত্রী,

তোমরা এমন আর কোনো শব্দ জানো কি যার প্রথমে সংখ্যা বাচক বিশেষণ আছে কিন্তু তা দ্বিগু সমাস হয় না, বহুব্রীহি সমাস হয়। জানলে কমেন্টে জানিও। না জানলেও বলো, আমি নাহয় তোমাদের বলে দেবো।

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

"আমরা" শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে কোন সমাস? (ব্যতিক্রমী ব্যাকরণ)

 "আমরা" শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে কোন সমাস? (ব্যতিক্রমী ব্যাকরণ)

আজ সমাসের একটি অত্যন্ত মজাদার এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করব। আমরা দৈনন্দিন জীবনে 'আমরা' শব্দটি কতবার ব্যবহার করি, তাই না? কিন্তু ব্যাকরণগতভাবে এই শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি আস্ত দ্বন্দ্ব সমাস!

'আমরা' শব্দটি হলো 'একশেষ দ্বন্দ্ব' সমাসের উদাহরণ।

এর ব্যাসবাক্য হলো:

তুমি, সে ও আমি = আমরা  (অথবা অনেক ক্ষেত্রে: সে ও আমি = আমরা)

কেন এটি ব্যতিক্রমী?

সাধারণ দ্বন্দ্ব সমাসে আমরা দেখি সবকটি পদই সমস্তপদে বজায় থাকে (যেমন: বাবা ও মা = বাবা-মা)। কিন্তু এই 'একশেষ দ্বন্দ্ব' সমাসের ক্ষেত্রে একাধিক পদের বদলে একটি মাত্র পদ (আমরা) অবশিষ্ট থাকে, যা বাকি সবার অর্থকেও বুঝিয়ে দেয়।

প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও সম্মানীয়, এমন আর কোনো শব্দের কথা জানা আছে কি যা একটি মনে হলেও আসলে তার ভেতরে একাধিক শব্দ বা কোনো সমাস লুকিয়ে আছে? নিচে কমেন্টে জানাও।

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সমাস শেখার সহজ কৌশল:

সমাস শেখার সহজ কৌশল:

কেন আমি 'দ্বন্দ্ব, দ্বিগু আর বহুব্রীহি' দিয়েই শুরু করি ! বাংলা বিষয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমি আমার ক্লাসে সবসময় 'দ্বন্দ্ব, দ্বিগু এবং বহুব্রীহি'—এই তিনটি সমাস সবার আগে পড়াই। এর পিছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলী কারণ রয়েছে:. সেগুলো অবশ্য এখানে আলোচ্য নয়। আমি মনে করি, সমাস শেখার ভয় দূর করতে সঠিক শুরুটা খুব জরুরি। আমি সেই ভাবেই শুরু করছি।

১. দ্বন্দ্ব সমাস (সমান গুরুত্ব): এখানে দুই পদেরই অর্থের প্রধান্য থাকে যেমন: ভাই ও বোন = ভাইবোন, (এখানে ভাইবোন বললে ভাই ও বোন দু’জনকেই বোঝায়, শুধু ভাই বা বোনকে বোঝায় না।) চেয়ার ও টেবিল = চেয়ারটেবিল ইত্যাদি

২. দ্বিগু সমাস (সংখ্যার ইঙ্গিত): সমাসবদ্ধ পদের শুরুতে সংখ্যাবাচক শব্দ থাকলে দ্বিগু সমাস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যেমন: তিন ভুবনের সমাহার = ত্রিভুবন, চার রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা ইত্যাদি। তবে সমস্ত পদটি সমাহার বা মিলন অর্থ বোঝাবে। এটি খেয়াল রাখতে হবে।

৩. বহুব্রীহি সমাস (নতুন দ্যোতনা): এখানে কোনো পদের অর্থ না বুঝিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা তৃতীয় কোনো অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যেমন: বিনা পাণিতে যার = বীণাপাণি (এখানে বীণা এবং পাণী বা হাত - কারো অর্থই বোঝায় না, সরস্বতী দেবীকে বোঝায়, যিনি হাতে বীণা ধারণ করে আছেন।) এইভাবে - প্রথম মুখে ভাত দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = মুখেভাত (এখানে মুখ বা ভাত কোনো অর্থই বোঝায় না, একটি বিশেষ অনুষ্ঠানকে বোঝায় যেখানে একটি শিশু প্রথম ভাত খায়।)

প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও সম্মানীয় পাঠক, 

সমাসের কোন বিষয়টি সবচেয়ে কঠিন লাগে? নিচে কমেন্টে জানালে আমি সরল করে কিছু বলার বা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। 

রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

The Meaning of Education : 'পড়াশোনা' শব্দের নিগূঢ় অর্থ।

 'পড়াশোনা' শব্দটির গঠন বিশ্লেষণ করলে আমরা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ খুঁজে পাই— 'পড়া' এবং 'শোনা'। একজন মানুষ তথা একজন ছাত্রের জীবনে এই দুটি শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম।

পড়া (Reading): এটি হলো কোনো বিষয় নিজে পাঠ করে তার মূল ভাবটি আত্মস্থ করা। এর মাধ্যমে একজন ছাত্রের চিন্তাশক্তি, ধৈর্য ইত্যাদি ব।.

শোনা (Listening): গুরু বা শিক্ষকের কাছে কোনো বিষয় মনোযোগ দিয়ে শোনা। শোনা মানে কেবল কান দিয়ে শোনা নয়, বরং কোনো বিষয় শুনে সেই জ্ঞানকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া।

প্রকৃত অর্থ (The Real Meaning): পড়াশোনা কেবল ডিগ্রি অর্জন বা পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার কোনো যান্ত্রিক উপায় নয়। এটি হলো নিজেকে ভেতর থেকে আলোকিত করার একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।

পরিশেষে : পড়াশোনা তখনই সার্থক হয়, যখন অক্ষর পরিচয়ের সাথে সাথে অর্জিত জ্ঞানের আলোকে আমরা উন্নত মানুষ হয়ে উঠতে পারি।

"আমার এই নতুন পথচলায় আপনাদের মতামত এবং চিন্তা একান্ত কাম্য। লেখাটি আপনাদের কেমন লাগল বা পড়াশোনা নিয়ে আপনার ভাবনা কী, তা নিচের Comment বক্সে অবশ্যই জানাবেন। ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যাকরণ ও সাহিত্যের সহজ পাঠ নিয়ে আপনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব।

শুভেচ্ছাসহ - পিন্টু বিশ্বাস


শুদ্ধ বাংলা সহজে জানুন : ১০টি প্রশ্নের একটি মজার কুইজ (পর্ব-২)

প্রিয় পাঠক ও ভাষাপ্রেমী অনুরাগী, আমি পিন্টু স্যার। আমার ব্লগ 'পিন্টু স্যারের সহজ বাংলা'-তে সকলকে স্বাগত জানাই। আমাদের মাতৃভাষা বাংল...