শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (১ম পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা,      

আমরা তো বইয়ের পাতায় কারক-বিভক্তি, সমাস অথবা বানানের নিয়ম মুখস্থ করি। কিন্তু এটা বোধহয় অনেকেরই অজানা যে, আমাদের চারপাশের রাস্তাঘাট, দোকান বা বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ডগুলোও হতে পারে আমাদের বানান ও ব্যাকরণ শেখার জ্যান্ত পাঠশালা! আসলে অজ্ঞতা বা সতর্কতার অভাবে সেখানে অনেক ভুলভ্রান্তি থেকে যায়, যেগুলো সচেতনভাবে খুঁজে নিয়ে চর্চা করলেই শুদ্ধ ও অশুদ্ধের পার্থক্য বোঝা অনেক সহজ হয়।

আজ এখানে এমনই একটি সাইনবোর্ড প্রদর্শন করছি, যেখানে সামান্য অসতর্কতায় পুরো বিষয়টিই ভুলের ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে।

জুয়েলারি দোকানের বিজ্ঞাপনে ব্যাকরণের ভুল ও সঠিক বানানের বিশ্লেষণ - পিণ্টু স্যারের সহজ বাংলা।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যাকরণ ও বানানের ভুল প্রয়োগ কীভাবে আমাদের বিভ্রান্ত করে—তার এক জ্যান্ত উদাহরণ!

১. অবিভাজ্য পদের বিভাজন :

সাইনবোর্ডটিতে লেখা আছে : "শিব দুর্গা জুয়েলারি" এবং নিচে "প্রস্তুত কারক- অসীম কর্মকার"।
বিভ্রাট : ব্যাকরণ অনুযায়ী 'শিবদুর্গা' একটি সমাসবদ্ধ পদ (দ্বন্দ্ব সমাস) এবং 'প্রস্তুতকারক' একটি অবিভাজ্য শব্দ (Compound word)। এই ধরণের শব্দগুলো সবসময় একসাথে বসে, এদের মাঝে কোনো ফাঁক (Space) রাখা অশুদ্ধ।
​কিন্তু পোস্টারটিতে 'শিব' ও 'দুর্গা' এবং 'প্রস্তুত' ও 'কারক' শব্দগুলোর মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত শূন্যস্থান ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধরণের পদ-বিভাজন কেবল দৃষ্টিকটু নয়, ব্যাকরণগতভাবেও একটি বড় ত্রুটি। 
শুদ্ধ প্রয়োগ হবে— 'শিবদুর্গা' এবং 'প্রস্তুতকারক'।

২. হ্রস্ব-উ আর দীর্ঘ-ঊ কারের অদলবদল :

​সবচেয়ে চমৎকার ভুলটি হয়েছে 'দুর্গা' এবং 'রূপা' বানান দুটিতে। যেটিতে যা হওয়ার কথা, ঠিক তার উল্টোটি করা হয়েছে :

দুর্গা : ছবিতে লেখা আছে 'দূর্গা' (দীর্ঘ-ঊ কার দিয়ে)। কিন্তু তৎসম শব্দ হিসেবে এর শুদ্ধ বানান হলো 'দুর্গা' (হ্রস্ব-উ কার)।

রূপা : এটি তৎসম শব্দ 'রূপ্য' থেকে বিবর্তিত একটি তদ্ভব শব্দ। নিয়ম অনুযায়ী এর শুদ্ধ বানান 'রূপা' (দীর্ঘ-ঊ কার)। কিন্তু ছবিতে লেখা হয়েছে হ্রস্ব-উ কার দিয়ে!

৩. বিদেশি শব্দের বানান বিধি :

​সাইনবোর্ডে 'গ্রীল', 'ষ্টীল' এবং 'জুয়েলারী' শব্দগুলো লেখা হয়েছে দীর্ঘ-ঈ কার ও 'ষ' দিয়ে।

নিয়ম : বাংলা একাডেমি ও প্রমিত বানানের নিয়ম অনুযায়ী, ইংরেজি বা বিদেশি শব্দে কখনো 'দীর্ঘ-ঈ' (\bar{i}) বা 'মূর্ধন্য ষ' (ṣ) হয় না।

সংশোধন : সঠিক বানানগুলো হবে যথাক্রমে— গ্রিল, স্টিল এবং জুয়েলারি।

৪. 'তৈরি' বনাম 'তৈরী' :

​একইভাবে, আধুনিক প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী ক্রিয়াপদ বা বিশেষণে ই-কার ব্যবহারের রীতি এসেছে। তাই 'তৈরী' নয়, শুদ্ধ হবে 'তৈরি'।

এক নজরে শুদ্ধিপত্র :

ভুল প্রয়োগ সঠিক বানান কেন ভুল? (যুক্তি)
শিব দুর্গা / প্রস্তুত কারক শিবদুর্গা / প্রস্তুতকারক অবিভাজ্য পদে বা সমাসবদ্ধ পদের মাঝে স্পেস হবে না।
দূর্গা দুর্গা তৎসম শব্দে হ্রস্ব-উ হয়।
রুপা রূপা তদ্ভব শব্দ হলেও দীর্ঘ-ঊ প্রচলিত।
গ্রীল / ষ্টীল গ্রিল / স্টিল বিদেশি শব্দে ঈ-কার বা 'ষ' হয় না।
জুয়েলারী / তৈরী জুয়েলারি / তৈরি আধুনিক নিয়মে ই-কার শুদ্ধ।
পরিশেষে :

আমরা যারা নিয়মিত শিখছি বা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ চাই, তাদের উচিত রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় চোখ দুটো শুধু সামনের দিকে নয়, রাস্তার দু-পাশের সাইনবোর্ড বা বড় বড় হোর্ডিংগুলোর দিকেও রাখা। সেখানে ব্যবহৃত ভুল বানান এবং ব্যাকরণগত ত্রুটিগুলোই আমাদের সঠিকটা শিখতে সাহায্য করবে। ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করা যে কতটা জরুরি—তা অনুধাবন করতে পারলেই আমাদের এই জ্যান্ত পাঠশালায় শেখা সার্থক হবে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (২য় পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা, ​আগের পর্বে আমরা একটি জুয়েলারির সাইনবোডের সাধারণ কিছু অসাবধানতা ও বানান বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা ক...