| পারস্যের 'সংবোসাগ' থেকে বাংলার 'সিঙারা'— এক বিবর্তনের সফরনামা। |
আমরা অনেকে যাকে 'সিঙারা' লিখি বা বলি, অনেকে আবার তাকেই বলেন 'সিঙ্গারা'। আধুনিক বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, শব্দের মধ্যে যেখানে 'ঙ' ব্যবহার করা সম্ভব, সেখানে 'ঙ' ব্যবহার করাই বিধেয়। তাই শুদ্ধ বানানচর্চায় 'সিঙারা' লেখাটিই সঠিক এবং আধুনিক। তবে অনেক আগে থেকে 'সিঙ্গারা' বানানটি প্রচলিত থাকায় এটিও ভুল নয়।
নামের আদি উৎস ও 'পাথর' রহস্য
সিঙারার আদি জন্মভূমি কিন্তু বাংলা বা ভারত নয়, বরং পারস্য (বর্তমান ইরান) এবং মধ্য এশিয়া। এর প্রাচীন নাম ছিল ফারসি শব্দ 'সংবোসাগ' (Sanbosag)।
ফারসি ভাষায় 'সং' (Sang) মানে হলো পাথর।
আর 'বোসাগ' মানে হলো তৃপ্তিদায়ক কোনো খাবার বা পিঠে।
প্রাচীনকালে এই খাবারটি তন্দুরে বা উনুনে এমনভাবে সেঁকা হতো যে এর বাইরের আবরণটি পাথরের মতো শক্ত এবং মুচমুচে হতো। সেই বিশেষ দৃঢ় গড়নের কারণেই রূপক অর্থে একে পাথরের সাথে তুলনা করে 'সংবোসাগ' বলা হতো। এখান থেকেই হিন্দিতে প্রচলিত 'সামসা'। এখানে আরো একটি মজার বিতর্ক আছে। অনেকে তিন কোণা আকৃতির জন্য সিঙারাকে 'তিন' সংখ্যার সাথে মেলাতে চান। কিন্তু ফারসি ভাষায় 'তিন' হলো 'সে' (যেমন: সেতার), 'সং' নয়।
সংস্কৃত যোগ :
ভারতবর্ষে আসার পর এ দেশের পণ্ডিতরা বা সংস্কৃত অনুরাগী সমাজ এর তিন কোণা আকৃতি দেখে এর একটি সংস্কৃত নাম দেন 'শৃঙ্গাটক' (তিনটি শৃঙ্গ বা শিং যুক্ত একটি জলজ ফল, যা পানিফল নামে পরিচিত)। এই 'শৃঙ্গাটক' শব্দ থেকেই বিবর্তিত হয়ে বাংলায় 'শিঙাড়া' বানানটিও প্রচলিত হয়েছিল। অর্থাৎ, খাবারটি এসেছিল বাইরে থেকে, আর এ দেশে এসে আকৃতি অনুযায়ী একটি গালভরা সংস্কৃত নাম পেয়েছে। যাইহোক, ফারসি এবং সংস্কৃত— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজ জন্ম নিয়েছে আমাদের প্রাণের 'সিঙারা'।
আদিতে এটি ছিল পুরোদস্তুর আমিষ!
অবাক করা তথ্য হলেও সত্যি যে, আদিতে সিঙারা কিন্তু নিরামিষ ছিল না। মধ্য এশিয়ার যাযাবর এবং শিকারিদের প্রিয় এই খাবারে আলুর বদলে থাকত মাংসের কিমা, পেঁয়াজ এবং শুকনো ফলের (যেমন কিশমিশ বা বাদাম) ঠাসা পুর। এটি অনেকক্ষণ ভালো থাকত বলে দীর্ঘ ভ্রমণের সময় মানুষ এটি সাথে রাখত। আজকের এই নিরামিষ আলুর সিঙারা বিবর্তিত হতে হতে সাধারণের প্রিয় হয়েছে, কিন্তু এর জন্ম হয়েছিল পারস্যের রাজকীয় পরিবেশে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ভারত ভ্রমণে আসা ইবনে বতুতা দিল্লির সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজদরবারে এই মাংসের কিমা ভরা সিঙারার স্বাদের কথা তাঁর ডায়েরিতে লিখে গেছেন। পারসিক ঐতিহাসিক আবুল-ফজল বায়হাকি, আমির খসরু-র মতো রাজকবিদের লেখায় সিঙারার (সাম্বুসা) উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভারতে এসে নিরামিষ রূপান্তর :
মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসার পর এখানকার মানুষের রুচি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সিঙারার ভোল বদলে গেল। এ দেশে এসে এটি হয়ে গেল পুরোপুরি নিরামিষ। বিশেষ করে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে যখন আলু জনপ্রিয় হলো, তখন সিঙারার ভেতরের মাংসের জায়গা দখল করে নিল মশলাদার আলু আর মটরশুঁটি। এই বিবর্তনের ফলেই আমরা আজকের এই পরিচিত স্বাদটি পেয়েছি।
স্বাদের ভিন্নতা : সিঙারা যখন মিষ্টি!
সিঙারার এই দীর্ঘ সফরে কেবল আলুর দম বা মাংসের কিমা নয়, ভাগ বসিয়েছে মিষ্টি ক্ষীরও।
ক্ষীরের সিঙারা : বাঙালির ঘরে ঘরে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে ময়দার খোলসের ভেতরে থাকে এলাচ দেওয়া ঘন ক্ষীর বা ছানার পুর।
বিজয়ার সিঙারা : অনেক জায়গায় বিজয়া দশমীর বিশেষ জলখাবার হিসেবে চিনি বা গুড়ের রসে ডোবানো ছোট ছোট 'মিষ্টি সিঙারা' দেওয়ার চল আছে।
পরিশেষে :
পারস্যের সেই পাথুরে আমিষ 'সংবোসাগ' আজ আমাদের পাড়ার মোড়ের পরিচিত নিরামিষ 'সিঙারা'। খাবার সহ শব্দের এই দেশান্তর আর বিবর্তনের গল্প সত্যিই চমকে দেবার মতো।
আরো পড়ুন ⤵️
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।