শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

বাক্যে থেকেও যারা কারক নয় : অকারক পদের সহজ পাঠ

আমরা যখন বাংলা ব্যাকরণে কারক শিখি, তখন জানি যে, ক্রিয়াপদের সাথে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সরাসরি সম্পর্ক থাকলেই তাকে কারক বলে। কিন্তু বাক্যে এমন কিছু পদ থাকে, যাদের সাথে ক্রিয়াপদের কোনো সরাসরি যোগসূত্র থাকে না। ব্যাকরণের ভাষায় এদেরই বলা হয় 'অকারক পদ' (Non-case relations)। 

এখানে এই অকারক পদ সহ তার বিভিন্ন ভাগ গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে অকারক পদ নিয়ে আর কোনো সংশয় না থাকে, এবং খুব সহজেই অকারক পদের দুটি বিভাগ নির্ণয় করা যায়। 

অকারক পদ আসলে কী?

​সহজ কথায় বলতে গেলে, বাক্যের যে নামপদের (বিশেষ্য বা সর্বনাম) সঙ্গে ক্রিয়াপদের কোনো সরাসরি অন্বয় বা সম্পর্ক থাকে না, তাকে অকারক পদ বলে। কারক হওয়ার প্রধান শর্তই হলো ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা। যেহেতু এই পদগুলো সেই শর্ত পূরণ করে না, তাই এদের নাম ‘অকারক’।

okarak pod bangla grammar pintusirer sohoj bangla
অকারক পদ : দুই প্রকার 

অকারক পদের প্রকারভেদ :

বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী অকারক পদ মূলত দুই প্রকার: ১. সম্বন্ধ পদ (Possessive) ২. সম্বোধন পদ (Vocative)

নিচে এই দুটি ভাগ নিয়ে বিস্তারিত এবং উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো।

১. সম্বন্ধ পদ : সম্পর্কের গল্প

যখন একটি বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে অন্য একটি বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সম্পর্ক থাকে, কিন্তু বাক্যের প্রধান ক্রিয়ার সঙ্গে সেই পদের কোনো সরাসরি সম্পর্ক বা যোগসূত্র থাকে না, তখন তাকে সম্বন্ধ পদ বলে।

উদাহরণ : রামের ভাই প্রতিদিন স্কুলে যায়।

বুঝে দেখি : এখানে 'যায়' হলো ক্রিয়াপদ। 'যায়' ক্রিয়াটি, বা যাওয়ার কাজটি করছে 'ভাই'। যদি প্রশ্ন করি— কে যায়? উত্তর হবে 'ভাই'। অর্থাৎ 'ভাই' পদের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু 'যায়' ক্রিয়াকে কোনো ভাবেই প্রশ্ন করে 'রামের' পদটিকে খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই 'রামের' শব্দটির সঙ্গে ক্রিয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং যদি 'ভাই' পদটিকে প্রশ্ন করি যে — কার ভাই? তাহলে সহজেই উত্তর আসে 'রামের'। ফলে, বোঝা গেল এখানে ভাইয়ের সঙ্গে রামের সম্পর্ক আছে; 'যায়' ক্রিয়ার সঙ্গে ভাইয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। যেহেতু ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নেই তাই 'রামের' হলো একটি সম্বন্ধ পদ।

চেনার সহজ উপায় :

• সম্বন্ধ পদের শেষে 'র' বা 'এর' বিভক্তি যুক্ত থাকে। যেমন - মাঠের (মাঠ + এর), নদীর (নদী + র)।

​• যখনই কোনো শব্দের শেষে 'র' বা 'এর' থাকবে এবং সেটি ক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত থাকবেনা, তখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে সেটি সম্বন্ধ পদ।

• বাক্যের বিশেষ্য বা সর্বনাম পদটিকে যদি 'কার?' বা 'কিসের?' দিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তবে যে উত্তর পাওয়া যাবে সেটি সম্বন্ধ পদ হবে। যেমন - গাছের ফল মিষ্টি।

​প্রশ্ন : কিসের ফল? উত্তর: গাছের। এখানে 'গাছের' হলো সম্বন্ধ পদ।

২. সম্বোধন পদ : ডাকার ভঙ্গি

​​'সম্বোধন' শব্দটির অর্থই হলো আহ্বান করা বা ডাকা। কাউকে ডাকতে বা সম্বোধন করতে যে পদ ব্যবহৃত হয় তাকে সম্বোধন পদ বলে। এই পদের মাধ্যমে বক্তা কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, কিন্তু সেই পদের সঙ্গে ক্রিয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয় না।

উদাহরণ : কিরে ভাই, এই দুপুরবেলা মাঠে যাচ্ছিস?

বুঝে দেখি : এখানে 'ভাই' বলে একজনকে সম্বোধন করা হচ্ছে। 'যাচ্ছিস' ক্রিয়াটির সঙ্গে 'ভাই' পদের সরাসরি ব্যাকরণগত সম্পর্ক নেই। ক্রিয়াকে নিয়ে যদি প্রশ্ন করা যায়  - কোথায় যাচ্ছিস? কখন যাচ্ছিস? তাহলে ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়, কিন্তু সে উত্তরে কখনোই 'ভাই' আসেনা। সুতরাং 'ভাই' পদটির সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক নেই। 'ভাই' হলো অকারক সম্বোধন পদ। 

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে - এই বাক্যে কর্তা কে? ভাই কি কর্তা নয়? না, ভাই কর্তা নয়।এই বাক্যে কর্তা উহা আছে। ভাইয়ের পরে একটা 'তুই' বসিয়ে যদি বাক্যটি এইভাবে লেখা যায়- ভাই, তুই এই দুপুরবেলা মাঠে যাচ্ছিস? তাহলে সম্বোধন পদ 'ভাই' এবং কর্তৃপদ (কর্তৃ কারক) 'তুই' কে খুঁজে পেতে বা বুঝে নিতে অসুবিধে হয়না।

চেনার সহজ উপায় :

▪︎ সম্বোধন পদের আগে সাধারণত ওরে, কিরে, ওগো, হে, ওহে, ওরে— এই জাতীয় অব্যয় পদগুলো বসে। কোনো অব্যয় ছাড়াও কেবল নাম ধরে ডাকলেও সেটি সম্বোধন পদ হয়।

• সম্বোধন পদের ঠিক পরেই একটি কমা ( , ) চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন: 'মা, আমায় একটি গল্প বলো।

• সম্বোধন পদে সাধারণত কোনো বিভক্তি থাকে না, অর্থাৎ শূন্য (অ) বিভক্তি হয়। 

এক নজরে সম্বন্ধ পদ ও সম্বোধন পদের পার্থক্য :

​এই দুটি অকারক পদের নাম খুব কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই গুলিয়ে ফেলে। নিচের চার্টটিতে এদের মূল তফাতগুলো দেখে নেওয়া যাক : 

তুলনার বিষয় সম্বন্ধ পদ সম্বোধন পদ
মূল কাজ অন্য নামপদের সাথে সম্পর্ক বা অধিকার বোঝায়। কাউকে আহ্বান করা বা দৃষ্টি আকর্ষণ করা বোঝায়।
বিভক্তি শব্দের শেষে সাধারণত 'র' বা 'এর' থাকে। সাধারণত কোনো বিভক্তি থাকে না (শূন্য বিভক্তি)।
অব্যয় পদের আগে আলাদা কোনো অব্যয় লাগে না। পদের আগে প্রায়ই হে, ওগো, ওহে, ওরে বসে।
যতিচিহ্ন কোনো বিশেষ চিহ্নের প্রয়োজন হয় না। পদের ঠিক পরেই সবসময় কমা ( , ) বসে
উদাহরণ এটি আমাদের, বাড়ি।মা, আমায় একটু জল দাও।

কেন অকারক পদ চেনা আমাদের জন্য জরুরি?

​অনেকে মনে করতে পারেন, ব্যাকরণের এই সূক্ষ্ম নিয়মগুলো জেনে আমাদের কী লাভ? আসলে প্রমিত বাংলা ভাষা চর্চায় এবং বাক্য গঠনে এই পদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা যখন কাউকে সম্বোধন করে কিছু বলি বা লিখি, তখন সম্বোধন পদের পর কমা ( , ) না দিলে বাক্যের গঠনশৈলী ব্যাকরণগতভাবে দুর্বল দেখায়। আবার বাক্যে কোনো কিছুর উৎস, উপাদান বা অধিকার প্রকাশ করতে সম্বন্ধ পদ আমাদের অনবরত সাহায্য করে (যেমন: "মাটির পুতুল" বা "শিক্ষকের উপদেশ")। এরা সরাসরি ক্রিয়া না করলেও বাক্যের অর্থকে পূর্ণতা দেয়।

উপসংহার

​অকারক পদগুলো বাক্যের মূল ক্রিয়ার কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও, এরা বাক্যের সৌন্দর্য বাড়ায় এবং বিভিন্ন পদের মধ্যে চমৎকার সেতুবন্ধ তৈরি করে। সম্বন্ধ পদ ছাড়া যেমন আমরা কোনো কিছুর ওপর অধিকার বা মালিকানা প্রকাশ করতে পারি না, ঠিক তেমনই সম্বোধন পদ ছাড়া কাউকে সম্মানের সাথে আহ্বান করা অসম্ভব। আশা করি, আজকের এই বিস্তারিত আলোচনার পর অকারক পদ (সম্বন্ধ ও সম্বোধন) বুঝতে এবং চিনতে কোনোই সমস্যা হবেনা। 

আরো পড়ুন ⤵️

কারক কাকে বলে? একটি বাক্যে সব কারক!

অন্য প্রসঙ্গ ⤵️

শব্দের গল্প  : আমাদের চশমা 👓


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার সুচিন্তিত মতামত বা প্রশ্ন এখানে জানাতে পারেন। গঠনমূলক এবং জানার আগ্রহে আলোচনা কাম্য।

প্রয়োগ বিভ্রাট : চারপাশের বানান ও ব্যাকরণ (২য় পর্ব)

উৎসাহী বাংলাভাষা অনুরাগী ও শিক্ষার্থী বন্ধুরা, ​আগের পর্বে আমরা একটি জুয়েলারির সাইনবোডের সাধারণ কিছু অসাবধানতা ও বানান বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা ক...